অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মুখে প্রায় দুইশত হাসপাতাল

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৮

চট্টগ্রাম মহানগরীর চাক্তাই এলাকায় গত শনিবার গভীর রাত্রে বস্তিতে আগুন লাগিয়াছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনিলেও ঘটনাস্থলেই ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হইয়া মারা যায় নারী ও শিশুসহ ৯ জন। ইতঃপূর্বে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। এই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতা অনেক কম থাকে বিধায় কোনো ধরনের স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শ পাইলেই দাহ্যবস্তু জ্বলিয়া ওঠে এবং তাহা ছড়াইয়া পড়ে দ্রুত। ঢাকার হাসপাতালগুলির অগ্নিঝুঁকি লইয়া বিশেষ সতর্কবার্তা অনেক আগেই দিয়াছিল ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটির প্রণীত ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের তালিকায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ মোট ২৪৮টি হাসপাতালের নাম রহিয়াছে। ইহা ছাড়া অতি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রহিয়াছে ১৭৪টি হাসপাতাল। ঝুঁকির তালিকায় থাকা হাসপাতালগুলিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিঝুঁকি হ্রাসে কিছু পরামর্শও দিয়াছিল ফায়ার সার্ভিস। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এইসকল পরামর্শের কোনোটিই আমলে নেওয়া হয় নাই। ইহার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ঘটিয়া গেল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। আগুন এমনই এক বিধ্বংসী শক্তি যাহা যেকোনো অনিয়মের সুযোগে ব্যাপক ধ্বংসসাধন করিতে পারে জীবন ও সম্পদের। সুতরাং অগ্নিঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করিলে অন্য হাসপাতালগুলিতেও যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটিতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্য হইতে জানা যায়, ২০১৭ সালের প্রথমদিকে ঢাকাকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করিয়া সকল ধরনের স্থাপনা পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়াছিল তাহারা। ইহার অংশ হিসাবে ঢাকার ৪৩৩টি হাসপাতাল পরিদর্শন করিয়া ফায়ার সার্ভিস অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিঝুঁকির আলামত দেখিতে পায়। মাটির নিচের জলাধারের ধারণক্ষমতা, অবস্থানকারীর সংখ্যা, প্রবেশদ্বারের প্রশস্ততা, স্মোক/হিট ডিটেক্টর, মেঝের আয়তন, জরুরি নির্গমন সিঁড়ি, লিফট ইত্যাদি বিষয় যাচাই করিয়া এই অগ্নিঝুঁকি নিরূপণ করা হয়। দেখা গিয়াছে, অসংখ্য হাসপাতালে নামকাওয়াস্তে ডিস্টিংগুইশার থাকিলেও ফায়ার অ্যালার্ম বা হিট ডিটেক্টর নাই। দাহ্যপদার্থপূর্ণ ভবনসমূহে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা কেন তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখিতে পারিতেছে না, সেই ব্যবস্থার ভিতরে গলদ আসলে কোথায় রহিয়াছে—ইহার অনুসন্ধান আবশ্যক।

‘জতুগৃহ’ বলিয়া একটি পৌরাণিক শব্দ রহিয়াছে, যাহা বিশেষ কারণে তৈরি করা হইয়াছিল অগ্নিকাণ্ড ঘটাইবার জন্য। আধুনিক সময়ে বিদ্যুতের শটসার্কিটের কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলিও আমাদের অজ্ঞতা ও অবহেলায় ‘জতুগৃহ’ হইয়া ওঠে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনাটি আমাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা। কিন্তু এই শিক্ষা কি আমরা সময়মতো যথাযথভাবে কাজে লাগাইতে পারিব? আমাদের বেশকিছু হাসপাতাল যথেষ্ট পুরাতন। এইগুলির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। কেবল হাসপাতাল নহে, সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানেরই বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা—তাহা নিয়ম করিয়া যাচাই করা আবশ্যক। নচেত্ একটি সুন্দর-আধুনিক প্রতিষ্ঠানও জতুগৃহে পরিণত হইবে।