সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দরকার ৪ পদক্ষেপ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৩৯

আজ ১০ অক্টোবর। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ‘অসম বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য’ স্লোগানে দিবসটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। একজন মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আচল ফাউন্ডেশনের একটি জরিপ আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর করা জরিপটি ভাবিয়ে তুলেছে।

ফাউন্ডেশনটি একটি জরিপে বলছে, দেশের ৮৪ ভাগ শিক্ষার্থী হতাশা, বিষণ্ণতা, ওসিডিসহ নানা মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এই জরিপে সাড়ে চার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে তাদের মনের অবস্থা জানায়।

শিক্ষার্থীরা অনেক দিন পর ক্লাসে প্রবেশ করেছে। করোনাকালীন সময়ে অনেকেই অর্থ সংকট, পরিবারের কেউ করোনায় আক্রান্ত হওয়া, দীর্ঘদিন বিদ্যালয় থেকে দূরে থাকার ফলে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। ফলে এখন পাঠদানের চেয়ে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব কম নয়। ফলে একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যুগোপযোগী ও মানসম্মত যে কৌশলগুলো নেওয়া দরকার তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে যেসব পদক্ষেপ নিতে পারেন তা হলঃ

(১) শিক্ষার্থীর আবেগ ও আচরণ শনাক্ত করুন। শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবচেয়ে প্রথম যে বিষয়টি জরুরি তা হল-শিক্ষার্থীর আবেগ শনাক্ত করা। প্রতিদিন ক্লাসের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বলতে দিন, তাদের মনের অবস্থা এখন কেমন। শিক্ষার্থীদের উত্তর দিতে যেন সুবিধা হয়, সেজন্য আপনি একটি ইমোশন চার্ট তৈরি করতে পারেন। ইমোশন চার্টিতে সব ইমোশন যেমন-সুখী, দুঃখী, হতাশ, আশাবাদীসহ নানান ইমোশনের ইমোজি যুক্ত করবেন। চার্ট দেখে শিক্ষার্থীরা যাতে বলতে পারে। মাঝে মাঝে তাদের লিখে দিতে বলতে পারেন। যে ইমোজিটা তাদের মনের সঙ্গে মিলে যায় সেটা কাগজে লিখে দিতে বলুন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই বলার সুযোগ দিন। মনে রাখবেন-শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে আপনি যে বিষয়ই পড়ান না কেন, তা শিক্ষার্থীরা ধারণ করতে পারবে না। কখনও কখনও চিরকুটে লিখতে বলুন। ‘মনের বাক্স’ নামে একটা বাক্স তৈরি করুন। যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের মনের অবস্থা তুলে ধরে আপনাকে লিখতে পারে। আপনিও ক্লাস শেষে প্রতিটি চিঠি খুলুন, পড়ুন এবং বোঝার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি আপনিও সাধ্যমতো উত্তর লিখুন। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যত্ন নিতে পাশে থাকার চেষ্টা করুন। শিক্ষার্থীদের বলার চেষ্টা করুন, পৃথিবীর সব কথাগুলো যেন নির্দ্বিধায় আপনাকেই বলতে পারে।

(২) শিক্ষার্থীর আবেগগুলোর স্বীকৃতি দিন। একটি শ্রেণিতে বিভিন্ন পরিবেশের শিক্ষার্থী থাকে। বিভিন্ন পরিবারের শিক্ষার্থীদের অবস্থান আলাদা আলাদা। একটি শিক্ষার্থীর কখনও মন ভালো থাকবে, খারাপ থাকবে, কখনো তারা হতাশয় থাকবে, কখনো উদ্বিগ্ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীদের আবেগগুলোর স্বীকৃতি না দিলে তারা আপনার সঙ্গে শেয়ার করবে না। কখনও কখনও আপনি আপনার আপনার মনের অবস্থা, আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা শিক্ষার্থীর কাছে তুলে ধরুন। শিক্ষার্থীদের বারবার বলবেন, মানুষ মাত্রই বিভিন্ন আবেগ থাকবে। জীবনে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে নানান আবেগের মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। শিক্ষার্থীদের সেইসব আবেগগুলো স্বীকৃতি দিন।

(৩) আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করার পথ প্রদর্শন করুন। ক্লাসের শুরুতে যখন আপনি জানলেন শিক্ষার্থীর মনোভাব। ক্লাস শেষেও জানার চেষ্টা করুন তাদের ক্লাস করার পর মনোভাব কী একই আছে নাকি পরিবর্তন হলো। যদি পরিবর্তন হয়, তাহলে কেন হলো, কীভাবে এই পরিবর্তন হল তাদের বলতে দিন। কী করলে মনের অবস্থা পরিবর্তন হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলগুলো বুঝতে পারবে। মন খারাপ থাকলে কী করলে মন ভালো হয় তা জানতে পারবেন। মনে রাখবেন, প্রতিটি সমস্যার সমাধান রয়েছে। এই সমাধান যেনো শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সমাধান করতে পারে। জীবনের সামনের দিনগুলোতে নিজেই নিজের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে তার জন্য সাহস ও সুযোগ দিন। দেখবেন শিক্ষার্থীরা সত্যিই অসাধারণভাবে আবেগগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।

(৪) শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক সুদৃঢ় করুন। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার কাজ শুধু পাঠদান করা নয়। একজন শিক্ষার্থী ঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা? শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য রাখাও আমার দায়িত্ব। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসুন। যদি সুযোগ পান একসঙ্গে টিফিন খেতে পারেন। মাসে কিংবা মাঝেমধ্যে ক্লাসের বাইরে সবাইকে নিয়ে আড্ডা দিন। বলুন আজকে কোন পড়া হবে না, নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য আজ গল্প হবে। নিজের সঙ্গে, নিজেদের সঙ্গে গল্প। শিক্ষার্থীদের ভালো লাগা, মন্দ লাগার বিষয়গুলো শেয়ার করতে দিন নিঃসঙ্কোচে। দেখবেন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক সুদৃঢ় হচ্ছে। এতে ক্লাসে পড়াতেও সুবিধা হবে। কখনও কখনও শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিষয় নিয়েই ক্লাস নিতে পারেন। আপনি যে শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দিচ্ছেন তা তারা বুঝতে পারবে।

একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করতে পারলে শিক্ষার পরিবেশ সুন্দর ও সাবলীল হয়ে যায়। নিজের ওপর অনেক চাপ কমে যায়। শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের কৌশলগুলো হাতে-কলমে শিখতে চাইলে alokitoteachers.com- এ সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং কোর্সটি করে নিতে পারেন। পাশাপাশি alokito teachers এর ফেসবুক পেইজে গিয়ে সোশ্যাল ইমোশনাল লার্নিং ওয়ার্কশপে অংশ নিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে আপনারও সোশ্যাল ইমোশনাল দক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে। সুস্থ ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ায় একধাপ এগিয়ে যাবেন।

প্রশিক্ষক,
আলোকিত টিচার্স ও এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট অফিসার,
আলোকিত হৃদয় ফাউন্ডেশন।
ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার: নির্দেশনা মানা হোক 

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ক্রপ জোনিংয়ের গুরুত্ব

অর্ধেক যাত্রীর নামে নৈরাজ্য নয়

‘হাতের কাছে ভরা কলস, তৃষ্ণা মেটে না’