বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কঠিন পথের লৌহকপাট

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২১, ১৭:০৪

॥ দুই ॥
কঠিন পথের লৌহকপাট

ছোট্ট চিরকুটটি হাতে পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়লেন নিউ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। দুখুর পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘এ যে দেখছি আমার বাল্যবন্ধুর চিঠি! ওকে কোথায় পেলে?’
   প্রধান শিক্ষকের উচ্ছ্বাস দেখে আশায় বুক বেঁধে দুখু জবাব দিলো, ‘ট্রেনে আমার সহযাত্রী ছিলেন। তিনিই দুই কলম লিখে দিয়েছেন।’
   ট্রেনে স্বল্প পরিচয়ে একটা কিশোরকে পড়াশোনার দেখভাল করার জন্য বন্ধুকে চিঠি লিখে দিতে পারে কেউ! নিশ্চয় এই ছেলের মধ্যে ভালো কোনো গুণ রয়েছে। ভেবে বললেন, ‘তোমার সব কথা খুলে বলো।’
   সুযোগ পেয়ে দুখু গরগর করে বলে গেল নিজের ছন্নছাড়া জীবনের কষ্ট আর দুর্দশার কথা। একইসঙ্গে জোরালোভাবে বলতে ভুলল না পড়াশোনার প্রতি তার গোপন আর দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার কথা।
   নগেন্দ্রনাথ বললেন, ‘তোমার কোনো গুণের প্রমাণ দিতে পারবে এ মুহূর্তে?’
   ‘আমার কোনো গুণ আছে কি না জানি না। তবে কবিতা আবৃত্তি করতে পারি, বাঁশি বাজাতে পারি, গান গাইতে পারি, লিখতেও পারি।’
   ‘তো। এখন কী দেখাবে আমাকে?’
   ‘বাঁশি বাজাতে পারলে আপনাকে খুশি করতে পারতাম। সাথে বাঁশি নেই। হারমোনিয়াম    থাকলে গানও শোনাতে পারতাম। তা-ও নেই।’
   ‘কী আছে সঙ্গে?’
   ‘মগজে কবিতা লুকিয়ে আছে। আবৃত্তি করব?’
   কথাটা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন নগেন্দ্র স্যার। বললেন, ‘দেখাও তো, দেখি কী লুকিয়ে আছে তোমার মগজে?’
   দুখু গরগর করে আবৃত্তি করতে লাগল ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি।
   হতবাক হয়ে গেলেন নগেন্দ্র স্যার। দুখুর মাথায় হাত বুলিয়ে কাছে ডেকে নিলেন তাকে। বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখে বললেন, ‘যাও। ভর্তি করে নিলাম তোমাকে।’
   ‘স্যার, আমি তো টাকা দিতে পারব না, ভর্তির ফি দিতে পারব না। ফ্রি ব্যবস্থা না করলে পড়াশোনা চালাতে পারব না।’
   ‘তা তো বলতে পারছি না। স্কুলের অবস্থা ভালো না। তবে তোমাকে আমি ফ্রি পড়ার ব্যবস্থা করব। শর্ত একটা, ভালো রেজাল্ট করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে।’
   ‘স্যার, ভালো রেজাল্ট করব, কথা দিতে পারছি না। তবে ভালোভাবে পড়ব, কথা দিচ্ছি। পড়ার প্রতি আমার আগ্রহের শেষ নেই।’
আবার চমকে উঠলেন নগেন্দ্র স্যার। দুখুর পিঠ চাপড়ে শুধুই বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট!’

নিউ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে গেল দুখু। তুমুল উৎসাহ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও মনে শান্তি পাচ্ছিল না। স্কুলে কোনো একটা সমস্যা চলছে, মনে হলো তার। কী সমস্যা, বুঝতে পারছে না। এর ফাঁকে একদিন অঙ্কের স্যার এসে বললেন, ‘আমাদের স্কুলের শ্রেণিকক্ষের মাটির দেয়াল ধসে গেছে। ঠিক করাব, সে টাকা নেই স্কুলের ফান্ডে। তোমাদের মধ্যে কেউ কি মাটির কাজ জানো? আমরা সবাই অংশ নিতে চাই। স্বেচ্ছাশ্রম। কে আছো?’
   দুখু দাঁড়িয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াল আরও কয়েকজন। স্কুলের পড়াশোনা বন্ধ রেখে সবাই মিলে দেয়াল তৈরির কাজে লেগে গেল। কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে দেয়ালটা দাঁড় করিয়ে ফেলল তারা।
   ভালো কাজে প্রশংসা পাওয়ার কথা। প্রশংসা কিংবা রিওয়ার্ড পেলে কাজে আরও উৎসাহ বাড়ার কথা, সেই আশা কখনো করে না দুখু। তিরস্কার আর অবহেলা যার সব সময়ের সঙ্গী তার আবার প্রশংসার দরকার কী! তবে বিনিময়ে ভর্ৎসনা পেলে কষ্ট হয়। কেন হয় জানে না সে। ভালো কাজ করে মনে শান্তি নিয়েই শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ক্লাস শুরুর অপেক্ষা করছিল দুখু। এমন সময় অঙ্কের স্যারের পরিবর্তে বাংলার স্যার এসে বললেন, ‘তোমাদের ক্লাসের কয়েকজন ভালো কাজ করেছ। এজন্য আমরা শিক্ষকরা খুশি।’
   প্রশংসা শুনে ছাত্রদের চোখও চকচক করে উঠল।
   কিন্তু খুশির মধ্যে কষ্টও ঢুকে গেল পরমুহূর্তে।
   স্যার আবার বললেন, ‘অনেক ছাত্রকে আমাদের ফ্রি চালাতে হয়। স্কুলের ফান্ডে টাকা নেই। ফ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না।’
   দুখু মুখ তুলে তাকিয়ে আছে স্যারের দিকে। চোখের ভেতর স্যারের মুখের ইমেজ ভেসে উঠছে না। শূন্য বুদ্‌বুদ ধরা পড়ছে। আলো-শূন্যতার বিরাট গর্তে পড়ে গেল সে। একবার বলতে ইচ্ছে হলো, হাত ধরুন, স্যার। ডুবে যাচ্ছি। কিন্তু বলতে পারল না সে।
   কিছুক্ষণ পরই ক্লাসরুমে এসে ঢুকলেন হেডস্যার।
   সবার উদ্দেশে তিনিও বললেন, ‘বাংলার স্যার যা বলেছেন, ঠিকই। তবে অষ্টম শ্রেণির কাউকে স্কুল ছাড়তে হবে না। স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে তারা স্কুলের দেয়াল মেরামত করে দিয়েছে। এটা পারিশ্রমিক না; কাজের বিনিময়ে অর্জিত সম্মান। এ সম্মান কেড়ে নেবেন না স্কুল কর্তৃপক্ষ।
   হঠাৎ দুখু প্রশ্ন করল, ‘এত টানাটানির মধ্যে স্কুল কীভাবে চলবে? আপনারা বেতন না পেলে কীভাবে কাজ করবেন? স্কুল কি বন্ধ হয়ে যাবে, স্যার?’
   ‘তোমার অনুমান ভুল হোক, এটাই চাই আমরা, দুখু। তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ১৯০১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন এই ১৯১৫ সালেই উঠে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে। আমরা এতে মনঃক্ষুণ্ন, হতাশাগ্রস্ত। আমাদের হতাশা তোমাদের ওপর চাপাতে চাইনি। যা আছে কপালে তাই-ই হবে। কঠিন সময় মেনে নিতে হবে। তবে আমি চাইব তোমরা হাল ছেড়ে দেবে না। পড়াশোনা ছেড়ে দেবে না কেউ। এ স্কুল না হলে অন্য স্কুলে যাবে, নিজেকে গড়ে তোলার পথ হারানো চলবে না। নতুন পথ খুঁজে নিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’
    স্যারের উপদেশবাণী মাথায় ঢুকছে না। বরং মনে হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের চাল উড়ে গেছে। বিস্তীর্ণ খোলা আকাশ ফেটে হঠাৎ করেই যেন আছড়ে পড়েছে মাথায়। শূন্যে আর মহাশূন্যে কি টেকা যাবে? অনিশ্চিত হাহাকার বুকে নিয়ে নিজেদের ছোট্ট মাটির ঘরের দিকে রওনা দিলো দুখু।
   হঠাৎ বুকের ভেতর কে কথা বলে উঠল! ‘কে?’
   প্রশ্ন করে থমকে দাঁড়িয়ে অনুভব করার চেষ্টা করল দুখু।
   ‘কে লুকিয়ে আছে তোমার বুকের ভেতর, ধরতে পেরেছ দুখু?’
   ‘না। ধরতে পারছি না।’
   ‘আমি তোমার, তুমি। তোমার গহিনে লুকিয়ে আছি।’
   ‘আমার আমি?’
    ‘হ্যাঁ।’
    ‘এও কি সম্ভব, আমার মধ্যে কি ‘আরেকটা আমি,’ লুকিয়ে থাকতে পারে?’
    ‘পারে। প্রমাণ হচ্ছি ‘আমি’।’
    ‘কী চাও আমার কাছে? কেন লুকিয়ে আছো আমার বুকের খাঁচায়?’
    ‘বুকের খাঁচায় না, লুকিয়ে আছি তোমার মগজে, তোমার চেনা মনের আড়ালে।’
    ‘কী চাও তুমি?’ আবার প্রশ্ন করল দুখু।
    ‘তুমি যা চাও, আমার মধ্যে তা ছাপ ফেলে দেয়। সেই ছাপ থেকে তোমার চাওয়া তোমাকে সামনে টেনে নিয়ে যায়। আমি কেবল ধারণ করছি তোমার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আর উৎসাহ। আমার নিজের কোনো চাওয়া নেই।’
    ‘তাহলে শুনে রাখো, দুঃখের জীবনে আমার কোনোই চাওয়া নেই। পালাও আমার ভেতর থেকে।’ বাইরের দুখু বলল।
   ‘অবশ্যই তোমার চাওয়াপাওয়ার বিষয় ধারণ করছি আমি। নেই বললেই হলো? নিজের থেকে নিজেকে কি আড়াল করা যায়?’ জোরালোভাবে প্রশ্ন করল নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অচেনা মন।
   অচেনা মনের কথার ধরন দেখে চমকে উঠল দুখু।
   ‘কী চাওয়া?’ নিজেকে প্রশ্ন করল এবার।
   ‘হাহা। এই তো লাইনে চলে এসেছ তুমি। এবার বলে দিচ্ছি তোমার মধ্যে লুকিয়ে আছে আগুন। অক্ষর সৃজনে বিস্ফোরণ ঘটাবে সেই আগুন। তোমার মধ্যে লুকিয়ে আছে অত্যাচারী ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ভারতবর্ষের দরিদ্র মানুষের দুর্দশা তুমি সইতে পারছ না। এসবের মোকাবিলা করতে হলে নিজেকে দাঁড় করাতে হবে আগে। পড়াশোনা শেষ করতে হবে। মেধা দিয়ে জয় করতে হবে সব নৃশংসতা। ঠিক বলিনি?’
   চমকে গেল দুখু। তাইতো। এসব তো ঠিকই ঘোরে তার মাথায়। নিশ্চয় অচেনা মন লুকিয়ে আছে মাথায়-মগজে-মস্তিষ্কে। ভাবতে গিয়েও নতুন আলোর দিশা পেল। ‘নিউ স্কুল’ বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে? শেষ হয়ে যাবে নিজের জীবন? নাকি পথের বাঁক পেয়ে খুঁজে নেবে আরেক পথ? হাল ছাড়বে না সে―হেডস্যারের কথার প্রতিধ্বনি বেজে উঠল চেনা মনের তারে। সঙ্গে সঙ্গে অচেনা মন বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ।’ 
   দুখু প্রশ্ন করল, ‘ধন্যবাদ দিচ্ছ কেন?’
   ‘তোমার তুমিকে তুমিই আবিষ্কার করতে পেরেছ। এটা বিরাট ব্যাপার। নিজেকে আবিষ্কার করার শক্তি সবার থাকে না। তোমার আছে। সেটা দেখার সুযোগ ঘটেছে আমার। এজন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য তোমার।’
   হকচকিয়ে গেল দুখু।
   অচেনা মন আবার বলল, ‘চমকে ওঠার কিছু নেই। এখন বাড়ি যাও। নিউ স্কুল বন্ধ হয়ে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অন্য স্কুলে চেষ্টা করবে। দরজা খুলে যাবে। কেউ তোমার এগোনোর দরজা বন্ধ করতে পারবে না। দরজা খুলে যাবেই তোমার তুমির সামনে।’
   ‘যেদিকে যাই, সেদিকেই তো দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আমার চলার পথ আটকে যায়।’ দুখু যুক্তি দেখাল।
   মগজের ভেতর অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করে উঠল হঠাৎ। সেই তারার আলো সামনে আছড়ে পড়ছে। দুখু দেখতে পেল কোনো দরজা বন্ধ হয়নি, তার চলার পথ এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। অন্য দরজা খুলে গেছে নিজের অজান্তে। সামনে নিশ্চয়ই রয়েছে আরও অসংখ্য অচেনা পথের দরজা, কঠিন পথের লৌহকপাটও নিশ্চয়ই খুলে যাবে একদিন। ভাবতে ভাবতে চুরুলিয়ার ছনের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরের দিকে এগোতে লাগল সে।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন