রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কচি-কাঁচার আসর

টগর ও টম

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:২০

শীতের সকাল। কুয়াশা পড়ছে। সূর্য মামাকে দেখা যাচ্ছে না। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। ভ্যান ছুটে চলেছে। ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছি। মা ও পিসি সামনে বসেছেন; বাবা-দাদা পেছনে আর আমি মাঝখানে। আমার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। মা জোর করায় যেতে হয়েছিল। আমরা মামাবাড়ি গিয়েছিলাম। বড়শি দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরা, দিদুনের (মায়ের মা) হাতের পিঠে-পুলি খাওয়া, গ্রাম ঘুরে দেখাসহ নানা আয়োজন ছিল। বাবা এবার কোনো বিষয়ে তেমন আপত্তি করেনি। শুধু খেজুরের রস কাঁচা খেতে নিষেধ করেছিল। বলেছিল, ‘কাঁচা রস খেলে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভাইরাসটির কোনো প্রতিষেধক নেই। কাঁচা রস কোনোমতেই খাওয়া যাবে না।’ বাবার কথামতো দিদুন তাই রস গরম করে খেতে দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে সবাই খুব আনন্দ করেছে। কিন্তু আমি মন খারাপ করেই ছিলাম। আমার মন পড়ে ছিল বাড়িতে।   

মায়ের মুঠোফোন বাজছে। স্যার কল করেছেন। আমাকে বাড়ি এসে পড়ান তিনি।

—মা, স্যার কী বলছিলেন?

—পড়াতে এসেছেন, কাল আসতে পারবেন না। আজ পড়াবেন।

ভীষণ কান্না পেল। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। ভেবেছিলাম, বাড়ি ফিরে টগরের সঙ্গে খেলব। টগর আমার পোষা কুকুর। গায়ের রং সাদা। গুলু-মুলু দেখতে। অনিন্দ্য কাকু কুকুরটা আমাকে দিয়েছিলেন। তিনি বাবার বন্ধু। টগর নামটাও তার দেওয়া। মনে আছে, নাম দেওয়ার সময় নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছিলেন কাকু। ‘কাঁদছেন কেন?’ জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, ‘তখন ফোর কি ফাইভে পড়ি। একদিন বাবা একটা কুকুরছানা নিয়ে এলেন। আমি তো খুব খুশি। ছানাটাকে খেতে দিই, ওর সঙ্গে খেলি। আমাদের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। বাবা ওর নাম রেখেছিলেন টম। ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্স, সিক্স থেকে সেভেনে উঠলাম। টমও বড় হলো। উঠোনে আমগাছের নিচে টমকে বেঁধে রাখা হতো। ওর ভয়ে অপরিচিত কেউ বাড়ির ভেতর আসার সাহস করত না। একদিন কী দিয়ে কী করে বাঁধন ছিঁড়ে টম বেরিয়ে যায়। আমি বাড়ি ছিলাম না। বাড়ি ফিরে আশপাশের সব জায়গায় খুঁজি, কিন্তু পাই না। টম হারিয়ে যায়।’

মামাবাড়ি পৌঁছানোর পর বারংবার কথাগুলো মনে পড়ছিল। টমের মতো টগরও কি... ভেবে কান্না পাচ্ছিল। বাবাকে বললে, বাবা বলেছিল, ‘চিন্তা করিস না। আমি বলছি, দেখিস, কিচ্ছু হবে না। দাদু-ঠাকুমা বাড়িতে আছেন। তাঁরা ঠিক দেখে রাখবেন। আনন্দ কর, চিন্তা করতে হবে না।’ তবুও কিছুতেই মন বসছিল না। টগরকে নিয়েই ভাবছিলাম। দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে ফোনে কথা হলে টগরের খোঁজ নিচ্ছিলাম।

ভ্যান উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠাকুমা বারান্দায় বসে স্যারের সঙ্গে গল্প করছিলেন। আমাদের দেখে উঠানে নেমে এলেন। গালে হামি দিয়ে  বললেন, ‘সোনা, মুখটা এত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন রে, বকেছে কেউ?’ ঠাকুমা আমাকে সোনা বলে ডাকেন।

—না, ঠাকুমা, কিছু হয়নি। টগর কোথায়?

ঠাকুমা উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে মা বলল, ‘আগে গিয়ে পড়তে বসো। স্যার অনেকক্ষণ এসে বসে আছেন।’

পুরনো বাড়ির চালের ওপর টগর বসে আছে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠলাম। টগর বলে চিত্কার দিলাম। চালটা অনেক পুরনো, নড়বড়ে। যখন-তখন ভেঙে পড়তে পারে।

‘সেই সকালে চালের ওপর উঠেছে তো উঠেছে, নামার নাম গন্ধ নেই।’ বললেন ঠাকুমা।

‘আশ্চর্য ব্যাপার, ও চালের ওপর উঠল কীভাবে!’ বলল বাবা।

সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মুখ ফিরিয়ে নিল টগর। বুঝলাম, অভিমান হয়েছে তার। ডাক দিলাম। স্যরি বললাম, কানে ধরলাম। এক লাফে নিচে নেমে এল টগর। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই লেজ নাড়তে শুরু করল। আমাকে দেখে খুশি হয়েছে। খুশি হলে সে লেজ নাড়ায়। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। টগরকে আদর করতে দেখে হাসতে হাসতে বলল, ‘বলেছিলাম না, টগরের কিচ্ছু হবে না। তবে চিন্তা থাকা ভালো, পোষা প্রাণীরা যেন খারাপ না থাকে, সেদিকে সব সময় খেয়াল রাখতে হবে।  আর কারো সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে মানে আমার সঙ্গেও যে খারাপ হবে—এটা ভাবা যাবে না। তবে সব বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। বুদ্ধি দিয়ে, সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই ভালো মানুষ হওয়া যাবে।’

বাবাকে নিচু হতে বলি। নিচু হতেই গালে একটা হামি দিই। তারপর স্যারের কাছে গিয়ে পড়তে বসি। টগরও সঙ্গে যায়। আমার পাশে চুপটি করে বসে থাকে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন