মহাভারতে আছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া অর্জুন যখন যুদ্ধ করিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগিতেছিলেন তখন শ্রীকৃষ্ণ জানাইয়াছিলেন যে, অর্জুনের এই রূপ দ্বিধা করিবার কোনো কারণ নাই। কারণ, এই যুদ্ধে অর্জুন নিমিত্ত মাত্র, যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই শ্রীকৃষ্ণ সকলকে মারিয়া রাখিয়াছেন এবং অর্জুনদের বিজয় পূর্ব হইতেই সুনির্দিষ্ট করা আছে। বিদ্বজ্জনেরা এই ক্ষেত্রে বলিতে থাকেন—দেবতারা কোনো বিজয় পূর্বনির্ধারিত করিয়া থাকেন অধর্ম দূর করিয়া সেইখানে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য; কিন্তু মানুষ একই কাজ করে অধর্ম বা দুর্নীতিকে আশ্রয় করিয়া। একই কাজ মানে কোনো বিজয় পূর্বনির্ধারিত করিয়া দেওয়া। মানুষ যেহেতু এই কাজটি অধর্ম বা দুর্নীতিকে আশ্রয় করিয়া সম্পন্ন করে, এই জন্য মানুষের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত জয়ের ফল কখনো শুভ হয় না। দুঃখজনকভাবে পূর্বনির্ধারিত জয় নিশ্চিত করা হয় কথিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে। গণতন্ত্রকে যতই ‘অফ দ্য পিপল বাই দ্য পিপল ফর দ্য পিপল’ বলা হউক না কেন, যাহার ভিত্তির উপর গণতন্ত্র দাঁড়াইয়া থাকে, জনগণের সেই ‘ভোট’ তথা ম্যান্ডেটকে ম্যানিউপুলেট করিবার অভূতপূর্ব সকল উপায় উন্নয়নশীল কিছু জনপদে এখন দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। বিশ্বের স্বনামধন্য কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলিতেছে, নির্বাচন কারচুপির মেকানিজমটা উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশ খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে। শাসক দলের কর্মীরা প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন কমিশনের সহিত যোগসাজশের মাধ্যমে নির্বাচনকে নিজের মতো সাজাইতে পারেন। বলা হইয়া থাকে, আর প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন এজেন্সি যখন সরকারের অধীনেই কাজ করে তখন নির্বাচন কমিশন অনেকটাই ঠুঁটো জগন্নাথ হইয়া পড়ে। এই কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বে সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্ভয়ে ভোট প্রদান এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন বহু ক্ষেত্রেই অকল্পনীয় হইয়া পড়ে। ফলে, উন্নয়নশীল অনেক দেশেই নির্বাচন লইয়া জনগণ আগ্রহ হারাইয়া ফেলিতেছে। এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনের জন্য নহে, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক।
প্রশ্ন করা যাইতে পারে—একটি বিশেষ পক্ষ প্রশাসনকে কী করিয়া নিজেদের আয়ত্তে রাখেন? আসলে এই ক্ষেত্রে আশ্রয় লওয়া হয় সেই চিরায়ত পরীক্ষিত ব্যবস্থার উপর। আর তাহা হইল ‘দুর্নীতি’। স্বেচ্ছাচারের মূল ভিত্তিটা হইল দুর্নীতি। এই দুর্নীতি প্রশাসনের সর্বত্র ছড়াইয়া দেওয়া হয়। প্রশাসন যখন স্বেচ্ছাচার সরকারের নিকট নতজানু থাকে, তখন সেই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন দিয়া আর সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভবপর হয় না। শুধু নির্বাচন নহে, ভালো কোনো কিছুই সম্ভব নহে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন দিয়া। এই কারণে আমরা যেই সকল মূল্যবোধের কথা বলি—ভোট ও বাক্স্বাধীনতার কথা বলি—এই বিষয়গুলি দুর্নীতি, দারিদ্র্যের জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশে বাস্তবায়ন করা সুদূর পরাহত হইয়া পড়ে। এখন এই সমস্যায় আকীর্ণ উন্নয়নশীল বিশ্বের সেই সকল দেশ কী করিয়া মুক্তি পাইবে? সামাজিক, পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত কারণে প্রশাসনে যাহারা থাকেন, সরকারের উপর তাহাদের নির্ভর করিবার বিষয়টিও সহসা ঠিক হইবার নহে। ইহা হইতে মুক্তি পাইতে একসময় হয়তো বিপ্লব হইবে, আন্দোলন হইবে; কিন্তু শান্তি আসিবে কি? দুঃখজনকভাবে এই ধরনের বিপ্লব ও আন্দোলনে যেই লোকক্ষয়, রক্তক্ষয় হইবে—তাহার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। কেবল স্বেচ্ছাচারিতার জন্য কোটি কোটি মানুষের এত দুর্ভোগ! ফলে আমরা যাহা চাই, যেই মূল্যবোধ প্রত্যাশা করি—তাহা শতযোজন পথ দূরেই থাকিয়া যাইতেছে।
মনে রাখিতে হইবে, অধিক ক্ষমতায় দায়িত্বের ভারও অনেক। সাধারণ মানুষের জন্য নিঃশ্বাস লইবার ন্যূনতম পরিবেশটিকেও যদি দিনের পর দিন রুদ্ধ করিয়া রাখা হয়, তখন সামান্য রন্ধ্র দিয়াই নূতন নূতন সন্ত্রাস ও হিংসা মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার ক্ষেত্র তৈরি হইয়া যায়। শান্তি তখন আর কিছুতেই ধরা দেয় না, সুদূর আকাশের মিটিমিটি তারা হইয়া থাকে।
