লুণ্ঠনই যেন নিয়ম, আর সততা যেন ব্যতিক্রম!

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:০০

যাহারা বাংলাদেশের জন্মের বহু পূর্ব হইতেই শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে পথে নামিয়াছিলেন-তাহাদের হৃদয়ে দেশ মানে ছিল আত্মার সহিত জড়িত এক অঙ্গীকার। তাহারা দেশের প্রতি ভালোবাসার এক বুক আবেগ লইয়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানটি গাহিতেন- 'আমার

এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।' দেশপ্রেমকে তাহারা ইমানের অঙ্গ বলিয়া মানেন। দেশ তাহাদের নিকট ছিল ন্যায়, সততা ও দায়িত্ববোধের এক আদর্শলিপি। সেই সকল মানুষই আজ ২০২৬ সালে দাঁড়াইয়া বিস্ময় ও বেদনায় নির্বাক। কারণ তাহারা দেখিতেছেন, যেই দেশের জন্য জীবন বাজি রাখিয়াছিলেন, সেই দেশেই লুণ্ঠন যেন নিয়ম, আর সততা যেন ব্যতিক্রম হইয়া গিয়াছে!

তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করিলেও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থ হইয়াছে। ইহা কেবল বিগত কোনো এক শাসনকালের গল্প নহে। স্বাধীনতার পূর্বে লুটপাট হইয়াছে, স্বাধীনতার পরও হইয়াছে এবং নানান সময় নানান রূপে ইহা চলিয়াই আসিতেছে। শাসকের মুখ বদলায়; কিন্তু ব্যবস্থার চরিত্র বদলায় না। এই ব্যবস্থাগত পচনের এক ভয়াবহ উদাহরণ সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলায় উন্মোচিত হইয়াছে। কাগজপত্রে সেইখানে শত শত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত। সড়ক, কালভার্ট, আয়রন ব্রিজ, গার্ডার সেতু-সকলই নথিতে বিদ্যমান; কিন্তু সরেজমিনে গিয়া দেখা যায়, নির্ধারিত স্থানে সেতুর পরিবর্তে বাঁশ ও সুপারিগাছের সাঁকো। পাঁচ গ্রামের মানুষ ঝুঁকি লইয়া সেই সাঁকো দিয়াই পারাপার করে। কাগজে শত শত স্কিম দেখাইয়া প্রায় সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। কোথাও ৯৬ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতুর জন্য প্রায় ১০ কোটি টাকার দরপত্র, অথচ কাজের নামে কয়েক দফা মাটি পরীক্ষা ছাড়া কিছুই নাই।

বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা তুলিয়া লওয়া হইয়াছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয়, একাধিক লাইসেন্স ব্যবহার করিয়া একই পরিবারের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলিই অধিকাংশ কাজের দায়িত্ব পাইয়াছে। উন্নয়ন এখানে জনস্বার্থের বিষয় নহে; ইহা ছিল পারিবারিক সম্পদ সঞ্চয়ের প্রকল্প। ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগের পুনর্বাসন প্রকল্পও এই লুণ্ঠনযজ্ঞের বাহিরে থাকে নাই। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামতের নামে শতাধিক ভুয়া স্কিম দেখাইয়া শত শত কোটি টাকা গায়েব। শহরের মাস্টারপ্ল্যান, গ্রামীণ অবকাঠামো, আঞ্চলিক সংযোগ সড়ক-সকলখানেই একই কাহিনি। প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব নাই; কিন্তু বিল ভাউচার সম্পূর্ণ। এলজিইডি, হিসাবরক্ষণ বিভাগ ও ঠিকাদারি ব্যবস্থার যোগসাজশে এই অর্থ লোপাট হইয়াছে।

এই জেলার ঘটনা শুনিয়া বিস্মিত হইবার কিছু নাই, যদি আমরা রাষ্ট্রের সামগ্রিক চিত্র দেখি। ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূত ঋণের নামে লুট হইয়াছে। ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হইয়াছে, মূল্যস্ফীতি বাড়িয়াছে। সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভাঙিয়া দিন কাটায়, আর লুটেরারা বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়িয়া তোলে। যাহারা এইভাবে লুটপাট করেন তাহাদের ব্যাপারে একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ বলিয়াছিলেন, এই লুটেরাদের ক্যাপিটেল পানিশমেন্ট দেওয়া উচিত। কারণ তাহারা জনগণের জীবন ধ্বংস করিতেছে, সুতরাং তাহাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

এই দৃশ্য কেবল বাংলাদেশের নহে। লাতিন আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় তৈল কোম্পানি লুট করিয়া একটি দেশকে দেউলিয়া করিবার ইতিহাস আছে। আফ্রিকার বহু দেশে খনিজসম্পদের আয়ের সিংহভাগ শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত হিসাবে জমা হইয়াছে। বস্তুত, দুর্নীতি রাষ্ট্রদেহের অন্ত্রে জন্ম লওয়া কৃমির মতো। বাহিরে উন্নয়নের চাকচিক্য থাকিলেও ভিতরে ভিতরে রাষ্ট্র রক্তশূন্য হইয়া পড়ে। ন্যায়বোধ লোপ পায়, নাগরিকের মধ্যে আস্থাশূন্যতা সৃষ্টি হয়। তখন প্রশ্ন উঠে-এই দেশ কাহাদের? লুটেরাদের, নাকি কোটি কোটি সাধারণ মানুষের?

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন