বিরোধ দুই নেতার, আর মাশুল দিচ্ছে পৌরবাসী!

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২১, ০১:০৭

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনের সুগন্ধা পয়েন্টে একটি মূল্যবান জমির দখল নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মোনাফ সিকদারের দ্বন্দ্বের জেরে দুর্ভোগে পড়েছে কক্সবাজার পৌরবাসী ও পর্যটকরা। মালিকানা দাবি করা দুই পক্ষের একজনের হয়ে মেয়র মুজিব ও অপর পক্ষের হয়ে মোনাফ জমি দখলে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ। 

মোনাফ-পক্ষকে কাবু করতে তাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা। মামলার পর মোনাফ লোকজনসহ গা ঢাকা দিলে মুজিব অনুসারীরা সেই জমি দখলে নেয়।

কিন্তু উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আসার পর কৌশলে মুজিব অনুসারীদের হটিয়ে মোনাফের পক্ষ জমির পুন:দখলে যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ হন মুজিব। এর জের ধরেই মোনাফকে গুলি করা হয়েছে বলে উঠে এসেছে আহত মোনাফের ভিডিও বার্তা ও তার স্বজনদের কথায়।

গুলি সংক্রান্ত ঘটনার আগাম আলোচনার একটি অডিও ফাঁস হওয়ার পর রবিবার বিকেলে মেয়র মুজিবকে হুকুমের আসামি করে মামলা হয়। এরপর থেকে মুজিব অনুসারীরা কক্সবাজার শহরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পৌরসভার আবর্জনা পরিবহনে ব্যবহার করা যানবাহন ও কর্মচারীদের ব্যবহার করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক অবরোধ করে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ভীতি সৃষ্টি করা হয়। সকল ধরণের নাগরিক সেবা বন্ধ করে দিয়েছে কক্সবাজার পৌর পরিষদ। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছে সেবা নিতে আসা পৌরবাসী।

সোমবার (১ নভেম্বর) ভোরে কক্সবাজার পৌরসভা প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র-১ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত মতে, মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, চলমান সড়ক উন্নয়ন কাজ এবং জাতীয়তা-জন্ম মৃত্যু সনদসহ পৌরসভার সব ধরনের নাগরিক সুযোগ সুবিধা অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কাউন্সিলরবৃন্দ।

এদিকে, সরকার দলীয় দুই মেয়রের নির্দেশে পৌর পরিষদের কর্মবিরতি ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখে আতঙ্কিত পর্যটকরা কক্সবাজার ছাড়ছেন বলে দাবি করেছেন হোটেল-মোটেল সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরসহ পর্যটনস্পট পরিদর্শনে হাজারো পর্যটক মহেশখালী ভ্রমণে গেলেও সোমবার কোনও পর্যটক মহেশখালী পার হননি বলেও উল্লেখ করেন ট্যুর অপরাটের সংশ্লিষ্টরা।  

হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউজ-কটেজ, রেস্তোঁরা মালিকদের সাতটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলির ঘটনার কারণে পর্যটকরা আতঙ্কিত। এরই মাঝে রবিবার রাতে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ ও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির কারণে যারা আরও কয়েকদিন থাকার জন্য বুকিং দিয়ে এসেছিলেন তাদের অনেকেই সোমবার রুম ছেড়ে দিয়ে কক্সবাজার ত্যাগ করেছেন। 

তার মতে, হোটেল-মোটেল জোনের আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার কক্ষ সোমবারে এভাবে ছেড়ে দেওয়ায় একদিনে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রুম ভাড়া ক্ষতি হয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষের। আর এসব পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থানকালীন সময়ে রেস্তোরায় খাবার, বিভিন্ন পর্যটন পণ্য ক্রয়সহ নানাভাবে দৈনিক আরও খরচ করতেন কয়েক কোটি টাকা। এসব থেকেও বঞ্চিত হয়েছে পর্যটন এলাকার ব্যবসায়ীরা।

গতকাল সোমবার কক্সবাজার পৌরসভায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। সেবা নিতে আসা আরাফা বেগম বলেন, তিনমাসেরও বেশি আগে মেয়ের জন্মনিবন্ধনের ভুল সংশোধন করতে দিয়েছি। আজ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভেতরেই ঢুকতে দিলো না। অথচ স্কুলে জমা দেওয়ার শেষ দিন মঙ্গলবার।

আরেকজন বলেন, মামলা করেছে যুবলীগ নেতার ভাই। মামলা হয়েছে ব্যক্তি মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে, মেয়রের বিরুদ্ধে নয়। এখানে কোন যুক্তিতে পৌর পরিষদের সেবা বন্ধ করা হয়েছে সেটাই বুঝছি না।

সেবা বন্ধের বিষয়ে কক্সবাজার পৌর প্যানেল মেয়র ২ ও শহর আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিন কবির বলেন, মুজিবুর রহমান একজন জনপ্রিয় নেতা। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাটি প্রত্যাহার করা হলে মেয়রের নির্দেশে সেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে। 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কক্সবাজারের উপসচিব (ডিডিএলজি) শ্রাবস্তী রায় বলেন, নাগরিক সেবা যে বন্ধ, তা আমি জানতাম না। এটি কোনভাবেই করতে পারেনা পৌরসভা। এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মেয়র ফোন না ধরায় বক্তব্য জানা যায়নি। 

ইত্তেফাক/এএএম