বন্ধ হোক র‍্যাগিং আর গেস্টরুম সংস্কৃতি

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২২, ২১:১০

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটি আসন যেন সোনার হরিণ। ভর্তিপরীক্ষার সময়ে ভর্তিপ্রত্যাশীদের আকাঙ্ক্ষা আর উত্কণ্ঠা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে, একটি আসন তাদের কাছে কতটা মূল্যবান। জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে একটা সুষ্ঠু এবং সুষম জীবন বিনির্মাণের তাগিদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আসন যে বড়ই দরকার। অনেকের হয়তো মেধা রয়েছে, তবে নেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে পড়ার সামর্থ্য। তাই তাদের একমাত্র গন্তব্য দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষার পরেই শুরু হয় প্রতিযোগিতা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে তো উতরে উঠতে হবে লক্ষাধিক ভর্তিপ্রত্যাশীদের চ্যালেঞ্জ। যথারীতি এক মহাযুদ্ধ শেষ করে তারা হাতে পায় সেই স্বপ্নলোকে দর্শন করা সোনার হরিণটি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আসন। 

তবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগের সেই খুশি আর আনন্দ ম্লান হয় যখন প্রথম দিন থেকেই, তাকে পড়তে হয় র‍্যাগিং নামক এক অসহ্য সংস্কৃতির মধ্যে। কোথাও কোথাও র‍্যাগিংয়ের মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরোনো শিক্ষার্থীদের সখ্য গড়ে তোলার জন্য যে পরিচিতি প্রথা, এ দেশে সেটাকে র্যাগিং বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবে আদবকায়দা, নিয়মকানুন শেখানোর নামে তাদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে আছে কান ধরে ওঠবস করানো, রড দিয়ে পেটানো, পানিতে চুবানো, উঁচু ভবন থেকে লাফ দেওয়ানো, সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেওয়া, গাছে ওঠানো, ভবনের কার্নিশ দিয়ে হাঁটানো, এমনকি দিগম্বর করা পর্যন্ত। আর মানসিক নির্যাতনের মধ্যে আছে গালিগালাজ করা, কুত্সা রটানো, নজরদারি করা এবং নিয়মিত খবরদারি করা।

যে ছাত্রটি কোনো উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলো প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, সেই ছাত্রটি পড়াশোনায় মনোযোগী না হয়ে ভয়ে আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকছে সিনিয়রদের র‍্যাগিংয়ের ভয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথমেই যদি একজন ছাত্র এমন মানসিক পীড়নের মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে তার জন্য এটা কতটা অবমাননাকর তা সহজেই অনুমেয়। র‍্যাগিংয়ের শিকার ছেলেটিও তার যোগ্যতায়ই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ লাভ করেছে। সুতরাং এই প্রতিষ্ঠানের তারও সমান অধিকার রয়েছে। এছাড়া আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে গেস্টরুম সংস্কৃতি। সারা দিন জুনিয়ররা কি করেছে তার হিসেব দিতে হয় রাত জেগে। এছাড়াও সেখানে চলে ম্যানার শেখানোর নামে নানান নির্যাতন। গেস্টরুম সংস্কৃতির করুণ পরিণাম আমরা দেখতে পাই বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক বিভিন্ন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ না করলেও চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীটির হলে সিট পাওয়ার কথা এবং লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করার কথা, ঠিক তখনি তাদের রাত জেগে সহ্য করতে হয় নানা শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার। র‍্যাগিংয়ের শিকার ছেলেটি বা মেয়েটির মধ্যে এক প্রকার প্রতিশোধপরায়ণ ভাব জন্ম নেয়। ফলে তারাও সিনিয়র হওয়ার পরে তাদের জুনিয়দের সঙ্গে একই আচরণ করে। ফলে এই সংস্কৃতি ক্রমেই বেড়ে চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীকে হতে হয় অতিশয় বিবেকবান মানুষ। তাই তাদের এই বিষয়গুলোতে সহনীয় এবং সংবেদশীল হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র-জুনিয়র ভাইবোনের ন্যায় সমপর্ক হওয়া উচিত-এটা তাদেরই ভাষ্য। তাহলে কেন ছোটভাই বোনদের ওপর নির্যাতন আর অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে হবে। ছোট ভাইবোন হলে তাকে আদর করেও ম্যানার শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। আর আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই ম্যানার শিখানোর অধিকার রাখেন। সুতরাং এই ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। গেস্টরুম আর র্যাগিং সংস্কৃতির নামে বন্ধ করতে হবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বজায় থাকুক সৌহার্দপূর্ণ সমপর্ক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হোক জ্ঞানার্জনের তীর্থক্ষেত্র, কোনো নষ্ট সংস্কৃতি চর্চার জন্য নয়।

  • লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ইত্তেফাক/আরকে