যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদ সাময়িকী 'টাইম' এবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের প্রথিতযশা স্থপতি রফিক আজমকে নিয়ে। জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকাঠামো ও পরিষেবা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা রফিক আজম তাঁর দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকাকে জলবায়ু সহিষ্ণু করে গড়ে তোলায় একটি নতুন পরিকাঠামো উদ্ভাবনে।
গত ২৮ অক্টোবর নিউইয়র্কভিত্তিক 'টাইম' ম্যাগাজিন রফিক আজম ও তাঁর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স সল্যুশন (জলবায়ু সহনশীল সমাধান) বিষয়ক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে।
বিশ্বের সবথেকে বেশি জন-ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা অন্যতম। এমনিতেই জলবায়ু ঝঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান খুবই আশঙ্কাজনক। আর সাম্প্রতিক অবস্থা বিবেচনায় বিশেষত এই প্রেক্ষিতে ঢাকা শহরের অবস্থা আরও সঙ্কটপূর্ণ। জলাবদ্ধতা যেনো ঢাকার নিত্যসঙ্গী। গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত, বছরের ১২ মাসই এই বিড়ম্বনায় পড়তে হয় নগরবাসীদের। অন্যদিকে সুপেয় পানির সঙ্কটের কথা তো বলাই বাহুল্য। নগর বিড়ম্বনার এমন চূড়ান্ত বাস্তবতাকে অনেকটা নীরবেই সয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকাবাসীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপই হবে বলে ভেবেছিলেন নগরবাসী।
'জলবায়ু সহনশীল ঢাকা'—এই স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণের আশা অনেকটা ছেড়েই দিয়েছিলেন স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকে। এত এত সমস্যার মধ্যেও ঢাকাকে বাঁচানোর উপায় বের করেছেন স্থপতি রফিক আজম ও তাঁর দল। তাঁরা ঢাকার নাজুক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নকল্পে ও সুপেয় পানির কার্যকর বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে একটি ভিন্ন পদ্ধতি বের করেছেন।
এই পরিকল্পনার আওতায় তাঁরা ঢাকা শহরে অবহেলিত কিংবা অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে থাকা পার্কগুলোকে সংস্কার করছেন। এর চারপাশে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ড্রেনেজ সিস্টেমকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে পার্কের পানি ধারণ ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। জমা হওয়া বৃষ্টির পানি পরিশোধন করে পানযোগ্য সুপেয় পানি হিসেবে এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এভাবে ঐ এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র অভাব যেমন দূর করা সম্ভব হয়েছে, তেমনি রাস্তায় পানি জমা কমাতে পারায় জলাবদ্ধতার সমস্যাও দূর করছে।
নতুন উদ্ভাবিত এই ভাবনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতায় জর্জরিত ঢাকার যেই চিরাচরিত দৃশ্য আমরা দেখে অভ্যস্ত, তা উল্লেখযোগ্য হারেই কমানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। টাইমের আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিষয়ক প্রতিনিধি আরিয়ান ব্যাকেরের করা ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিকাঠামোর মাধ্যমে রফিক ও তাঁর দল এখন পর্যন্ত সফলভাবে ঢাকা শহরের ৩১ টি কমিউনিটি পার্ক ও খেলার মাঠকে আমূল বদলে দিয়েছেন।
রফিক আজমের মতে, চ্যালেঞ্জকে সমস্যা হিসেবে দেখা দুঃখজনক। বরঞ্চ একে উদ্ভাবনের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করলেই তা ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনকে দিন কমছেই। জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট ভোগান্তিও চরমে। রফিক আজম উদ্ভাবিত এই পরিকাঠামো, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) ও তা থেকে সুপেয় পানি সরবরাহ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে একটি আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে অনুশীলিত হতে পারে। শুধু ঢাকাই নয়, বাংলাদেশের অন্যান্য মহানগরী তে এমনকি বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা এবং জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা নিচু শহরগুলোর জন্যও এই পরিকাঠামোটি কার্যকর একটি সমাধান হতে পারে।
স্থপতি রফিক আজম আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি স্থপতি। 'সাতত্য—আর্কিটেকচার ফর গ্রিন লিভিং' নামের একটি স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে পার্ক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের কাজ নিয়েও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছেন তিনি। পরিকল্পনা করছেন একটি মানবিক ঢাকার। এছাড়াও রফিক আজমের তৈরি প্রতিটি স্থাপনায় প্রকৃতি, জল ও মানবিক গল্প মিশে থাকে। দেশেবিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করার পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন নানা পুরষ্কার।
