সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

বিশ্বকাপ ব্যর্থতা ও ব্যথা

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ০০:৫০

সমস্যার শুরু অনেক আগে। একটু ফ্লাশব্যাকে যাই।
মিরপুরে বিসিবি অফিস। বৈঠক চলছে। এজেন্ডা: টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল কী হবে? বৈঠকে উপস্থিত তিন নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, হাবিবুল বাশার ও আব্দুর রাজ্জাক। আছেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, হেড কোচ রাসেল ডমিঙ্গো।

ওপেনিং জুটি নিয়েই আলোচনার শুরু।
-তামিম ইকবাল।নামটা উচ্চারিত হওয়ার পর হেড কোচ রাসেল ডমিঙ্গো ব্যাখ্যায় যা বললেন, তাকে আদালতের ভাষায় ‘নারাজি’ বলে। কোচের ব্যাখ্যার ধরন ছিল কার্যত এমন, পেছনের প্রায় দেড়বছর ধরে তামিম ইকবাল টি-টোয়েন্টিতে খেলছেন না। তার জায়গায় আমরা তরুণ এক খেলোয়াড়কে তৈরি করছি। তাকে খেলাচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে এখন তামিম দলে এলে যাকে আমরা তৈরি করছিলাম, তাকে বাদ দিতে হবে।
ওপেনিংয়ে তামিম প্রসঙ্গে এই ব্যাখ্যা শোনার পর বৈঠকে উপস্থিত টিম ম্যানেজমেন্টের আর কোনো সদস্য তাকে দলে থাকার পক্ষে যুক্তি দেখালেন না। এমনকি অধিনায়কও রহস্যজনকভাবে নীরব।

তামিম বিশ্বকাপে থাকছেন কি-না, সেই বিষয়ে কোনো ফয়সালা ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়। তবে বৈঠকে এই আলোচনায় তামিমের কানে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তামিম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। টিম ম্যানেজমেন্ট এমনকি অধিনায়কই যখন তাকে চাইছেন না, তাহলে কেন তিনি দলে থাকবেন?

মূলত আত্মমর্যাদার প্রশ্নেই বিশ্বকাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তামিম। বোর্ড সভাপতিকেও জানিয়ে দিলেন। এরপর মিডিয়াকে বললেন, আমার কারণে কোনো তরুণ খেলোয়াড় সুযোগ হারাক, সেটা চাইবো না। তাই এই বিশ্বকাপ থেকে সরে গেলাম।

তামিমের এই নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্রিকেটীয় যুক্তি থাকলেও অভিমানের অংশটা অনেক বড়। তামিমের মতো এমন অভিমান করেছিলেন মুশফিকুর রহিমও।

বিশ্বকাপ দলে কে কে থাকবেন; এই প্রশ্নে মুশফিকের প্রতিও অনাস্থা দেখান কোচ। মুশফিকের কানেও যায় সেই কথা। তামিমের মতো মুশফিকও নিজেকে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন। তাকে ফেরান স্বয়ং অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ। আত্মীয়তার সূত্রে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ ভায়রা ভাই। কোচের সিদ্ধান্তে গোস্‌সা করলেও মাহমুদউল্লাহর অনুরোধে মুশফিক অভিমান পুষে রাখলেন না। বিশ্বকাপ দলের সারথী হলেন।

সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটালেন ক্রিকেটাররা। ব্যর্থতা ঢাকতে বিলাপ করলেন। তাতে ব্যথা তো কমলোই না; পরন্তু সংকট আরও বাড়লো।

বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হারের পর বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন স্বীকার করে নিলেন, দলে তামিমের না থাকাটা বড় ক্ষতি হয়ে গেলো। তিনি আরও জানালেন, শুধু তামিম নন, আরেকজন ক্রিকেটার বিশ্বকাপে খেলতে চাননি এবার। যদিও নাজমুল সেই ক্রিকেটারের নাম উল্লেখ করেননি। সেই ‘দ্বিতীয় অভিমানী’ আর কেউ নন-মুশফিকুর রহিম!

তামিমের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপেনিং জুটির সংকট বিশ্বকাপজুড়েই থাকলো। প্রতি ম্যাচেই পাওয়ার প্লে’তেই ‘পাওয়ার ফেল’! সেই ধাক্কা পড়লো মিডলঅর্ডারে। শুরু হলো মিডলঅর্ডারের ধুঁকে চলা। শেষ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ইনিংস শেষ। ম্যাচ হারলো বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে। প্রতি ম্যাচেই আগের ভুল থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাংলাদেশ দল পরের ম্যাচে আরও বড় ভুল করলো। আরও বাজেভাবে হারলো। সুপার টুয়েলভের প্রতি ম্যাচেই ডাগআউটে দুঃখী হতাশ ও ঝুলে পড়া মুখের ক্রিকেট দলের দেখা মিললো। যে মানের ক্রিকেট খেললো বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট জুড়ে তাতে অপেশাদার দল নাবিবিয়ারও নিচে আমাদের অবস্থান!

বাছাই পর্বে স্কটল্যান্ডের কাছে হারের পর বাংলাদেশ সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হলো। এমনকি বোর্ড সভাপতিও সেই ম্যাচে হারের পর যা বললেন, তাতে আরও চুরমার হয়ে গেলো পুরো দলের আত্মবিশ্বাস। এমন হারের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। তাই ফেসবুক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়া এবং আমজনতা চারধারের সব প্রান্ত থেকে ক্রিকেটারদের যোগ্যতা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলো। একযোগে ধেয়ে আসা এই সমালোচনা সইতে পারেননি ক্রিকেটাররা। তাই তারা পরের দুই ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ওমান ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দলের বিরুদ্ধে জিতলেন, তখন ভাবলেন এবার সমালোচকদের একহাত নেওয়া যেতে পারে।

মাহমুদউল্লাহ পেইন কিলার খেয়ে মাঠে নামার দুঃখী গান গাইলেন। মুশফিকুর রহিম আয়নায় মুখ দেখার তত্ত্ব হাজির করলেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে সাকিব শ্লেষের সুরে বললেন, আপনি বললে স্বপ্ন বদল করতেও পারি। আর প্রেস কনফারন্সে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া বেচারা স্পিনার নাসুম আহমেদ তো বলেই দিলেন, আমাদের দিয়ে হচ্ছে না!

মাঠের প্রতিপক্ষের চেয়ে মাঠের বাইরের প্রতিপক্ষ খুঁজে নিলেন যেন ক্রিকেটাররা। কাজে নয়, কথায় এবং তর্কে জিততে চাইলেন। আর সেখানেই বড় ভুল হলো। মাঠের ক্রিকেট থেকে মনোযোগ, ফোকাস টলে গেলো তাদের। ২২ গজে কিভাবে ক্রিকেট খেলতে হয়, সেটাই যেন ভুলে বসলো পুরো দল!

ক্রিকেটাররা ভুলে গেলেন, প্রশংসা পেলে সমালোচনার কাঁটাও সহ্য করতে হয়। কিন্তু এই বিশ্বকাপের শুরুতে সেই সহনশীলতা দেখাতে পারেননি ক্রিকেটাররা। আবেগের বড়ি গিলে আর্তনাদ করলেই সব ব্যথা দুর হয় না। দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট সহ্যের অভ্যাসও গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু দল তা পারলো কই?

সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটালেন ক্রিকেটাররা। ব্যর্থতা ঢাকতে বিলাপ করলেন। তাতে ব্যথা তো কমলোই না; পরন্তু সংকট আরও বাড়লো। জয়ের কাছে এসেও জিততে ভুলে গেলো দল। অথচ এই দলটা বিশ্বকাপে রওয়ানা হয়েছিল সেমিফাইনালের স্বপ্ন নিয়ে। ফিরছে এখন সর্বাঙ্গে ব্যথা আর ব্যর্থতাকে সঙ্গী করে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, রাইজিংবিডি  

ইত্তেফাক/এনই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার: নির্দেশনা মানা হোক 

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় ক্রপ জোনিংয়ের গুরুত্ব

অর্ধেক যাত্রীর নামে নৈরাজ্য নয়

‘হাতের কাছে ভরা কলস, তৃষ্ণা মেটে না’