ইমান না থাকিলে বিশৃঙ্খলা আসিবেই

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২১, ১৮:৩০

দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া সংঘর্ষ, হামলা, হানাহানি, ধাওয়া-পালটা ধাওয়া এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়াই চলিতেছে। প্রতিদিনই পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেলের নিউজ ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এই সকল সহিংসতার খবর প্রকাশ পাইতেছে। আমরা দেখিতে পাইতেছি, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হামলা, মারামারি, সহিংসতার ঘটনা যেন স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হইয়াছে। অথচ সেই সকল দেশে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত রাখিবার জন্য এবং সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করিবার জন্য থানার ওসি হইতে শুরু করিয়া এসপি কিংবা ডিআইজিদের মতো কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করিয়া থাকেন। অথচ তাহার পরও দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সহিংসতার ঘটনা ঘটে। অনেক জায়গায় নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পূর্বে সেইখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। নির্বাচনে পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত থাকিলেও অনেক সময় দেখা যায় তাহাদের প্রয়োজনের তুলনায় গাড়ি কিংবা জনবল নাই। কোথাও বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটিলে সেইখানে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল জনবল কিংবা লজিস্টিক সাপোর্ট লইয়া তাহা মোকাবিলা করা কার্যত অসম্ভব হইয়া পড়ে। ঘটনা ঘটিবার পর বিভিন্ন প্রকারের তদন্ত কমিটি এবং নানা পদক্ষেপ লওয়া হইবেÑবলা হয় বটে; কিন্তু অন স্পট যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ লইতে পারিত তাহা হইলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলি কমাইয়া আনা যাইত। 

বিপদে আপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়াইবেÑএই মহান উদ্দেশ্যে তাহাদেরকে জনগণের বন্ধু বলা হইয়াছে। অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ মানুষের নানা ধরনের বিচার, সালিশ কিংবা বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলি সামলাইতেই তাহাদের সময় পার হইয়া যায়। মনে রাখিতে হইবে, তাহাদের প্রধান দায়িত্ব হইল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা। তবে দায়িত্ব পালন করিতে গেলে তাহাদের বিভিন্ন বাধাবিপত্তির সম্মুখীনও হইতে হয়। ক্ষমতাসীন দলের প্ল্যাটফরম ও সুবিধা ব্যবহারকারী কোনো মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করিবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বদলি করিবার মতো ঘটনাও কোথাও কোথাও দেখা যায়। ইহার ফলে ভোগান্তি এড়াইতে অন্য কেহ তৎপর হইতে উৎসাহিত হন না। আইনের ভিতরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যেই ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে, সেই ক্ষমতা যদি তাহাদের প্রয়োগ করিবার সুযোগ দেওয়া হইত তাহা হইলে মাদক হইতে শুরু করিয়া নির্বাচনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সহিংসতাÑসকল কিছুই নিয়ন্ত্রণে লইয়া আসা যাইত। আইনেই রহিয়াছে অপরাধীর পক্ষে কেহ তদবির করিতে আসিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিবার কথা। পুলিশ বাহিনী যদি এই সকল আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ ঘটাইতে পারিত তাহা হইলে অপরাধীদের পক্ষে কেহ তদবির করিতে সাহস পাইত না। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত রাখিবার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হইতে শুরু করিয়া প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তারা নিয়োজিত রহিয়াছেন, কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে অপারগ হইলে কিংবা বাধার সম্মুখীন হইলে উপর মহলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাইবারও বিধান রহিয়াছে। সুতরাং তাহারা যদি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতেন তাহা হইলে অন্তত শৃঙ্খলা বজায় থাকিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সহজ বিষয় তখনই হইবে যখন ওসি, এসপি, ডিআইজি সকলকেই তাহাদের আইনের ভিতরে বিদ্যমান যেই ক্ষমতা রহিয়াছে তাহা যথাযথভাবে পালন করিবার সুযোগ দেওয়া হইবে। বাস্তবতা হইল উন্নয়নশীল বিশ্বে ইহা পূর্বে কখনো হয় নাই, এখনো হইতেছেও না, এবং ভবিষ্যতেও হইবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

উন্নয়নশীল বিশ্বে যখন যাহারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন তাহারা সকলেই আইন মানিয়া চলিবার কথা বলেন। অথচ দেখা যায় তাহারা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করিবার কাজ করিতেছেন। তাহাদের কথা ও কাজের এই অমিল কি মুনাফিকি নহে? ধর্মগ্রন্থসমূহেও বলা হইয়াছে তুমি যাহা পারিবে না, তাহা বলিয়ো না। প্রতিটি ধর্মেই ইমানকে সঠিক এবং দৃঢ় রাখিবার কথা বলা হইয়াছে। ইমানের সহিত দায়িত্ব পালন করিলে এই সকল বদনামের ভাগিদার হইতে হইত না তাহাদের। উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া হানাহানি, সহিংসতা, হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা অব্যাহত থাকিলে একসময় এই সকল দেশে নির্বাচনের অস্তিত্বই হয়তো বিলীন হইয়া যাইবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি