অনিশ্চয়তায় যুবরাজ সালমানের ভবিষ্যত্!

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৫৩

 

সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার দেড় মাস পার হয়েছে। আস্তে আস্তে রহস্যের জাল খুলেছে। এক এক করে বেরিয়ে আসছে হত্যাকারী ও পেছনের নির্দেশদাতাদের নামও। প্রথম থেকেই নির্দেশদাতা হিসেবে সবার সন্দেহের শীর্ষে ছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ যুবরাজ সালমানই দিয়েছেন। যদিও তারা সরাসরি সৌদি যুবরাজকে অভিযুক্ত করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে হত্যার নির্দেশদাতার নাম প্রকাশ করা হবে।

সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সনদ নিতে গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে নিখোঁজ হন ওয়াশিংটন পোস্টের নিয়মিত কলামিস্ট জামাল খাশোগি। যিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের একজন কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত ২০ অক্টোবর নিখোঁজের প্রায় ১৮ দিনের মাথায় সৌদি আরব স্বীকার করেছে যে, কনস্যুলেট ভবনেই খুন হয়েছেন খাশোগি। তবে প্রথমদিকে সৌদি আরব এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকারই করতে চায়নি। তারা জানায়, কনুস্যলেটে মারামারির সময় মৃত্যু হয়েছে খাশোগির। এরপর কয়েক দফা ব্যাখ্যা বদলে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। খাশোগির মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। তুরস্কের গণমাধ্যম বলছে, খাশোগির মরদেহ এসিডে গলিয়ে দেহাবশেষ ড্রেনে ফেলে দিয়েছে হত্যাকারীরা। সৌদি কনস্যুলেটের ড্রেনে এসিডের আলামত পাওয়া গেছে। এছাড়া ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসাল জেনারেলের বাসভবনে হাইড্রোফ্লুরিক এসিড ও অন্যান্য রাসায়নিকের আলামত পাওয়া গেছে। খাশোগির মরদেহ না পাওয়ায় এই তথ্য অনেকটাই সত্য বলে মনে করা হচ্ছে। গত শুক্রবার সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় খাশোগির গায়েবানা জানাজা হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজ জড়িত নয় বলে জানানো হয় সৌদি সরকার ও চিফ প্রসিকিউটরের পক্ষ থেকে। সৌদি যুবরাজ নিজেও হত্যাকারীদের বিচারের অঙ্গীকার করেছেন। গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে মরুর দাভোস খ্যাত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে হাজির হয়ে যুবরাজ সালমান বলেন, সাংবাদিক খাশোগির হত্যা একটি জঘন্য অপরাধ। এই হত্যাকাণ্ড সকল সৌদি নাগরিক ও বিশ্বের মানুষের জন্য কষ্টের। হতাকাণ্ডে জড়িত সকল অপরাধীর বিচার হবে। খাশোগি হত্যাকাণ্ডে নিজেদের মতো করে তদন্ত করে ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে সৌদি সরকার। এর মধ্যে পাঁচ জনকে ফাঁসির সাজা দিতে চায় সৌদি আরব। পশ্চিমারা প্রকৃত অপরাধীর নাম প্রকাশে আহ্বান জানালেও সৌদি আরব কর্ণপাত করেনি।

যদিও তুরস্কসহ সারা বিশ্ব এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ানের দাবি খাশোগি হত্যার নির্দেশ সৌদি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকে সৌদি রাজ পরিবারকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। কারণ সৌদি যুরবাজের সঙ্গে তার জামাতার সুসম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্পের প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১১০ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি করেছে সৌদি আরব। ট্রাম্পের মতে, তিনি সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না যাতে দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়। এছাড়া কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতেও রাজি নন তিনি।

যদিও দেশের অভ্যন্তরে এ ঘটনায় চাপের মুখে পড়তে হয়েছে ট্রাম্পকে। গত মাসের শেষদিকে হঠাত্ করেই ট্রাম্প বলেন যে, খাশোগিকে হত্যার ঘটনায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান জড়িত থাকতে পারেন। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যুবরাজই সবচেয়ে তত্পর। তিনিই সব কিছু করছেন। তাই এখন কাউকে সন্দেহ করতে গেলে তার নামই এসে যায়। বিশ্লেষকরাও বলছেন, এ হত্যাকাণ্ড যে সৌদি আরবের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রই সৌদি আরবকে চাপ দিয়ে খাশোগি হত্যার প্রকৃত তদন্ত করাতে পারে।

গত শুক্রবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বলেছে, তাদের বিশ্বাস খাশোগি হত্যার নির্দেশ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই দিয়েছিলেন। সিআইএ’র ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তারা এই প্রমাণ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, এ রকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযান কেবল যুবরাজের অনুমতি নিয়েই হতে পারে। তবে সৌদি আরব এ রকম দাবিকে মিথ্যা বলে বর্ণনা করেছে। তারা বলছে, যুবরাজ এই হত্যা পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেছেন, খাশোগির হত্যাকারীদের বিচার হতে হবে। দায়ীদের সবাইকে এর দায় নিতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন দু-একদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে।

মার্কিন গণমাধ্যমগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় আঘাত। এতোদিন ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি কর্তৃপক্ষকে রক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সিআইএ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নেবে! মধ্যপ্রাচ্যের একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সিআইএ’র তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য খুবই কঠিন ছিল।

ইতিমধ্যেই খবর রটেছে যে, মোহাম্মদ বিন সালমানকে হয়তো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে! বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের এক ভাই সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেছেন। তিনি দেশে ফেরার পর এই গুঞ্জন জোরালো হয়। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপে বেশ চাপে পড়েছে সৌদি আরব। এখন সৌদি বাদশাহ চাইলে ছেলেকে সরিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এটা করলে সবার কাছে স্পষ্ট হবে যে, নিজের ছেলেকে যুবরাজ করার সিদ্ধান্ত বাদশাহের সঠিক ছিল না। এটা বিতর্ক তৈরি করবে। আবার তাকে না সরালে এই সিদ্ধান্তও বিতর্ক তৈরি করবে। কিন্তু ভবিষ্যত্ বাদশাহ যিনি হবেন তার বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে যত সমালোচনা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে তাকে যুবরাজ পদে রাখাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাদশাহের জন্য। বাদশাহ’কেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যুবরাজ থাকবেন কিনা। ফলে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রভাবশালী যুবরাজের ভাগ্য।