বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত জোর দিয়েছেন প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ওপর । যে ৪৮টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন তাদেরকে আশু সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা । যুক্তি হলো বিশ্বে কার্বন নির্গমনে তাদের অংশ মাত্র শতকরা ৫ ভাগ । যাদের কারণে বিশ্বে প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে তাদেরকে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নিতে হবে- এ সুর বারংবার ধ্বনিত হয়েছে বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রীর মুখে। সুবিদিত যে দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভারত এবং ইউরোপের কতিপয় শিল্পায়িত ধনী দেশ। অর্থাৎ, জি-২০ এর প্রায় প্রতিটি দেশই একাতারভুক্ত । স্তরবিন্যাসিত বিশ্বে এরা ধনী দেশ; বাকিরা আধা ধনী এবং গরীব বা স্বল্পোন্নত । মানব সমাজের মত এখানে ও বিভাজন খুবই স্পষ্ট । উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো মাতব্বরির কাছে বাকিরা যেন ছানাপোনা । এর মধ্যে ও কিছু কিছু উন্নয়নশীল দেশের নেতা সাহসী, সত্য বক্তব্য রাখতে চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্কটল্যান্ডের জলবায়ু সম্মেলন ( কপ-২৬) মূল পর্বে লিডার সামিটে দেয়া বক্তৃতায় এমনটিই প্রতিভাত হয়েছে । প্লেনারি-২ এর কনফারেন্স অব দি পার্টিস যা জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেশনের আওতার অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে তিনি সুনির্দিষ্ট চারটি বস্তুনিষ্ঠ প্রস্থাব উপস্থাপন করেন।
১। বাংলাদেশের পরিকল্পনা বা এনডিসির অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন যে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিলসহ ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এনার্জি চাহিদার ৪০ শতাংশ নেওয়া হবে;
২। উন্নত দেশগুলোর উচিত হবে অভিযোজন ও প্রশমনের মধ্যে ৫০:৫০ ভারসাম্য বজায় রেখে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করা;
৩। সিভিএফ (Climate Vulnerable Forum) ও ভি-২০ এর সভাপতি হিসেবে তিনি এ ও বলেন যে উন্নত দেশগুলোর উচিত ঝুঁকিতে রয়েছে যে সব দেশ তাদেরকে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিচ্ছন ও সবুজ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার আশু ব্যবস্থা নেওয়া এবং সিভিএফ দেশগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান এবং,
৪। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি , লবণক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও খরার কারণে বাস্তুচুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য বিশ্বব্যাপী দায়বদ্ধতা ভাগ করে নেওয়াসহ লোকসান ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি সমাধান করা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আফসোস করে বলেন যে বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমনের মাত্র ০.৪৭ শতাংশেরও কম অংশের জন্য দায়ী বাংলাদেশ কিন্তু দেশটি নানান কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী দেশগুলোর অন্যতম। কথাটিতে দ্বিমত পোষণ করার অবকাশ না থাকলে ও কিছু কথা থেকে যায়।
প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে হলেও ৫১টি অভিন্ন নদীর পানির সুষ্ঠু ভাগাভাগির না হওয়ার কারণে বাংলাদেশের জলবায়ুয়ে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে এবং অব্যাহত ভাবে পড়তে থাকবে এ কথাটি বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী তেমন জোর দিয়ে গ্লাসগোর আন্তর্জাতিক ফোরামে উল্লেখ করেছেন বলে মনে হয় না । রোহিঙ্গা শরণারথীদের কথা, তাদের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে যে বিরূপ প্রভাব একথাটি সঙ্গতভাবে এ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বলেছেন কিন্তু ভারতের সাথে নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমস্যাটি যুক্তি দিয়ে আরও পরিষ্কার ভাবে
তুলে ধরলে তা বিশ্বব্যাপী প্রচার হতো সমুদ্র সীমা ভাগাভাগি বা সমুদ্র জয়ের মত এ সমস্যাটি ও একটি সম্মানজনক সমাধানের দিকে হয়তোবা কিছুটা হলে ও অগ্রসরমান হতো । আশা করছি সাইড লাইনে হয়তো বা ভারতের সাথে এ সময়ে ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে । কপ-২৬ গোঁট ৩১ অক্টোবর শুরু হয়েছে । চলবে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত । প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জারা এসেছেন তাদের কেউ কেউ থেকে যাবেন । তারা ও যদি বাংলাদেশর পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চলমান সমস্যাগুলো নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলেন তাহলে ও বিশ্ব জনমতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে অসময়ে যে বন্যা, খরা, তিস্তা, বাঙ্গালী, করতোয়া সহ বেশ কটি নদীর মরোমরো অবস্থা, সেচ প্রকল্পগুলো সমস্যাগ্রস্থ, উত্তাল, উন্মত্ত পদ্মায় বিস্তীর্ণ চর, মরুপ্রক্রিয়ার ক্রমবৃদ্ধি, ইত্যাদি সমস্যাগুলো জোরেশোরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আসলে ভাল হতো । সময়ে-অসময়ে বন্যা বা নিমজ্জন, লবণক্তা বৃদ্ধির অপ্রতিরোধ্য গতি, নদ-নদীর পানি প্রবাহে নানা সমস্যা যা সময়মত আন্দাজ ও করা যায় না, নদী-খাল-বিল, হাওর-বাওর, বিল সহ পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া বা মরে যাওয়া, বনজঙ্গল নিধন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা ও পরিকল্পিত কার্যক্রম এ সময়ে খুবই দরকার । উজানের দেশে নদীতে যত্রতত্র বাঁধ এবং ভাতির দেশ বাংলাদেশের ভুমিপ্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব এসব নিয়ে কথা বলা অপ্রাসঙ্ঘিক হতোনা তেমন । পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন অঙ্গনে কিছু কিছু অগ্রগতি হচ্ছে তবে খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, বিশ্ব অঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে সময়টি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার একটি কাঙ্ক্ষিত সময় হতে পারে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। শিল্পবিপ্লবের দুইশত বছর পার হয়ে গেলে পরিবেশ দূষিতকরন ও জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট সমস্যা মাত্রারিক্ত ভাবে বেড়েই চলেছে। সমস্যাটি নিয়ে বিগত ৪০ বছর ধরে প্রচুর আলাপ-আলোচনা, সম্মেলন হচ্ছে, জাতিসঙ্ঘ মনুষ্য সৃষ্ট গ্রিন হাউস গ্যাস উদ্গিরন নিয়ে আলোচনার প্রচুর সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে সেই ১৯৯০ থেকে কিন্তু ফলাফল তেমন আশা ব্যাঞ্জক নয়। আমাদের ধরিত্রীর তাপমাত্রা কমেনি, আয়ত্তে ও আসেনি বরং তা বেড়েই চলেছে । ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশাবাদ যেন অলীক কল্পনা। যেখানে গ্লাসগো সম্মেলনে ১০০র বেশি দেশের রাষ্ট্র প্রধানগণ অংশ নিচ্ছেন সেখানে রাশিয়া ও চীনের প্রেসিডেন্টদের অনুপিস্থিতি নানান প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। এ দুটো দেশ আমেরিকার পরেই পরিবেশ ও জলবায়ু দূষণের জন্য দায়ী। দ্রুত শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমরাস্ত্র, খনি সম্পদ, বিশেষত তেল ও কয়লা আহরণ ও ব্যবহারে মাধ্যমে কম খরচে
সম্বৃদ্ধি এ লক্ষ্যে দেশ দুটি কাজ করে যাচ্ছে। আগামী ২০-৩০ বচ্ছরে মধ্যে এদের জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলন ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশ দুটো ও তাদের তাবেদার রাষ্ট্রগুলোকে দেখা যাবে বলে মনে হয় না।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক অধ্যাপক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
