চোখ রাঙাইতেছে বিশ্বখাদ্য নিরাপত্তাহীনতা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২১, ০৭:০০

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাইবার কারণে প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামে তাহার নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হইতেছে। অস্থির হইয়া উঠিয়াছে চাউল, আটা, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি প্রভৃতি ভোগ্যপণ্যের বাজার। ইহা লইয়াই এখন সর্বত্র আলোচনা চলিতেছে। কিন্তু শুধু কি বাংলাদেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়াছে? বিষয়টি মোটেও তাহা নহে। বরং করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে সারা বিশ্বেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম এখন ঊর্ধ্বমুখী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সূত্র অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর গত ১০ বত্সরের মধ্যে খাবারের দাম বর্তমানে সর্বোচ্চ। গত মাসে বিশ্বে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়াছে ১০ শতাংশ। খাদ্যশস্যের দাম বাড়িয়াছে ২২ শতাংশের বেশি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন ব্যয় ও শিল্পের কাঁচামালের দামও বাড়িয়াছে অস্বাভাবিক হারে। তাহারই এখন খেসারত দিতেছেন সাধারণ গ্রাহকগণ।

মহামারি করোনা বিশ্ব অর্থনীতিকে তছনছ করিয়া দিয়াছে। পরিস্থিতি কখন আবার স্বাভাবিক হইবে তাহা আমরা কেহ জানি না। বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্ব সবচাইতে বেশি বিপাকে পড়িয়াছে। তাহাদের আমদানি-রফতানি ব্যয় বাড়িয়া গিয়াছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া যায় তাহা সবাইকে গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। করোনার প্রভাবে গত বত্সর বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য ৩০ শতাংশের বেশি বাড়িয়া যায়। এই বত্সরও দরবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রহিয়াছে যাহা বিশ্ববাসীর জন্য নানা চাপ সৃষ্টি করিতেছে। যাহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তাহাদের নাভিশ্বাস উঠিতেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত এফএও’র মাসিক খাদ্যমূল্য সূচকে দেখা যায়, অক্টোবরে সূচক ছিল ১৩৩.২ পয়েন্ট, যাহা সেপ্টেম্বরের চাইতে ৩ শতাংশ বেশি। অক্টোবরে বিশ্ববাজারে খাবারের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ীর তালিকায় শীর্ষে রহিয়াছে গম। কানাডা, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান গম রফতানিকারক দেশগুলিতে লক্ষ্যমাত্রার চাইতে কম উত্পাদনের কারণে গত এক বত্সরে গমের দাম বাড়িয়াছে প্রায় ৪০ শতাংশ। শুধু গত মাসেই বাড়িয়াছে ৫ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় অভিবাসী শ্রমিক সংকটের কারণে টানা চার মাস ধরিয়া পামওয়েলের দাম বাড়িতেছে। গত এক বত্সরে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বাড়িয়াছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০২১ সালে বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উত্পাদনে নূতন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭৯৩ মিলিয়ন টন। কিন্তু পূর্বাভাসের চাইতে ৬.৭ মিলিয়ন টন কম উত্পাদিত হইয়াছে। ইরান ও তুরস্কেও কাঙ্খিত হারে গম উত্পাদিত হয় নাই।

বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়িয়াছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশে নজিরবিহীন বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলিয়া জাতিসংঘ সতর্কতা জারি করিয়াছে। বিশেষ করিয়া ইথিওপিয়া, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ সুদান ও ইয়েমেনে প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতিতে নিপতিত হইয়াছে। সামপ্রতিক মাসগুলোতে বুরকিনা ফাসো ও নাইজেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী প্রায় একই পরিস্থিতিতে পড়িয়াছে। এমন দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতিতে থাকা অন্তত ৪ কোটি মানুষকে সহায়তার জন্য দ্রুত তহবিল গঠন করিতে হইবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের তথ্য মতে, বিশ্ব জুড়িয়া প্রায় ৬৯ কোটি মানুষ ভয়াবহ দরিদ্রতার সঙ্গে বসবাস করিতেছেন। করোনার কারণে আরো ৮৫ কোটি মানুষ দরিদ্রতার ঝুঁকিতে পড়িয়াছেন। সুতরাং আগে খাদ্য দরিদ্রতা কমাইতে বিশ্বনেতাদের নজর দিতে হইবে।

উল্লেখ্য, বিশ্ব অর্থনীতিবিদরা এই বত্সর খাদ্যশস্যের বাম্পার ফলনের পূর্বাভাস দিয়াছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পূর্বাভাসের প্রতিফলন ঘটে নাই। এখন চারিদিকে যে ত্রাহি অবস্থা ও নূতন নূতন সংকট দেখা দিতেছে, তাহা মোকাবিলা করিবার জন্য বাংলাদেশকে সতর্ক হইতে হইবে। নির্ধারণ করিতে হইবে নূতন কৌশল ও করণীয়। এইজন্য দেশজ খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির বিকল্প নাই। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন