সর্বত্র গ্রহণযোগ্যতা স্থাপন করিতে হইবে

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২১, ১১:১৩

এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। কিছুতেই থামানো যাইতেছে না ইহার লাগাম। নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গত শনিবার রাতে একজন যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করিয়া হত্যা করা হইল। এই খবর বাসি না হইতেই গতকাল সোমবার মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হইলেন দুই সহোদর। আহত হইলেন অর্ধশতাধিক। ভোট চাইবার সময় বর্তমান মেম্বার ও সাবেক মেম্বারের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়া গেলে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। ইউপি নির্বাচন এখনো শেষ হয় নাই। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপে ৮৪৬টি ইউপিতে নির্বাচন চলিতেছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে আগামী ১১ নভেম্বর।

তৃতীয় ধাপে ১ হাজার ৩টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে আগামী ২৮ নভেম্বর। নির্বাচনের আগে প্রচারণার দিনগুলিতে যেই হারে সহিংসতার ঘটনা ঘটিতেছে, তাহাতে নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি কোথায় গিয়া দাঁড়ায়—তাহা চিন্তার বিষয়। গত ২০ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর দুই দফায় প্রথম ধাপে ৩৬৫টি ইউপির ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু গত ৫ নভেম্বর পর্যন্ত ইউপি নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হইয়াছেন ২৫ জন। শুধু দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে প্রাণ হারাইয়াছেন ১৯ জন। ইউপি নির্বাচনে এই সহিংসতার বিষয়টি উদ্বেগজনক বিধায় এখনই ইহার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরো মনোযোগী হইতে হইবে।

ইউপি নির্বাচনে নিজ নিজ সমর্থকদের ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের রীতিমতো হুমকি দেওয়া হইতেছে। নির্দিষ্ট প্রতীক উল্লেখ করিয়া বলা হইতেছে, সেই প্রতীকে ভোট না দিলে পরিণাম ভালো হইবে না। ইহা কোনো সুস্থ নির্বাচনি সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। জনসভায় এমন কথাও বলা হইতেছে যে, সেই নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দিলে যাহাতে কেহ ভোটকেন্দ্রে না আসেন। নির্বাচন কমিশন কেন এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছে না? গতবারের মতো এইবারও দলীয়ভাবে শুরু হইয়াছে ইউপি নির্বাচন। অনেকে সহিংসতার জন্য দলীয় প্রতীকে ভোট গ্রহণকে দায়ী করিতেছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, ইহাই একমাত্র কারণ নহে। কেননা উন্নত বিশ্বসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশেও দলীয়ভাবেই স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আসলে গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতাই আমাদের মধ্যে গড়িয়া উঠিতেছে না। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে আধাসামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার কারণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা বিকশিত নহে। পশ্চিমবঙ্গেও পঞ্চায়ত নির্বাচনসহ জাতীয় নির্বাচনগুলিতে ব্যাপক সহিংসতা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। এই প্রবণতা হইতে বাহির হইয়া আসিবার জন্য আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করিতে হইবে। জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন সাধন করিতে হইবে।

এবারের ইউপি নির্বাচন কয়েকটি বিরোধী দল আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করিয়াছে। তবে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতেছেন তাহাদের কেহ কেহ। এখন পর্যন্ত ১৭টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ইউপি ভোটে অংশগ্রহণ করিতেছে। এই হিসাবে সহিংসতা তেমন হইবার কথা নহে। কিন্তু সর্বত্র বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়িতে এবং তাহাদের মধ্যে চলা রেষারেষিতে সহিংসতা বৃদ্ধি পাইতেছে। ইহা ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীর অন্তর্দ্বন্দ্বের ফসল। ইহার পিছনে স্থানীয় রাজনীতির নানা সমীকরণ ও স্বার্থগত দ্বন্দ্বও ক্রিয়াশীল। এইরূপ পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন অসহায় ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইউপি নির্বাচন নিয়া এমপি-মন্ত্রিদেরও অনেকে দ্বিধাবিভক্ত। সব মিলাইয়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচন লইয়া গ্রহণযোগ্যতার অভাব দেখা দিয়াছে। নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট হইবার কারণে নির্বাচনের প্রতি মানুষের তৈরি হইয়াছে অনাস্থা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনি বৈতরণী পার হইবার প্রবণতা বাড়িবার কারণেও নির্বাচন হইয়াছে প্রশ্নবিদ্ধ। ইউপি নির্বাচন হইল তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণের নির্বাচন। এই নির্বাচনই যদি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহা হইলে ইহার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উপরই বর্তাইবে। এই ব্যাপারে কোনো অজুহাত দেওয়ার অবকাশ নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন