তারা এখন স্বাবলম্বী

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:৩৯

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত অবহেলিত ঋষিপাড়ার নারীরা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মদক্ষ করায় তারা এখন বাড়িতে বসেই রোজগার  করতে পারছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুহিলপুর ইউনিয়নের সীতানগর গ্রামের ঋষিপাড়া একটি পিছিয়ে পড়া জনপদ। তিতাস নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামের পুরুষরা শহরের বিভিন্ন স্থানে মুচির কাজ (জুতা সেলাই, জুতা পালিশ) এবং শহরের বিভিন্ন বাজারে কুলির (শ্রমিক) কাজ করে। গ্রামের মহিলাদের কেউ কেউ শহরের বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর  কাজ করলেও অধিকাংশ মহিলা বেকার। বাড়িতে বসেই তাদের অলস সময় কাটতো। ফলে তাদের সংসারে সব সময় লেগে থাকতো অভাব-অনটন। অভাব-অনটনের কারণে ঋষিপাড়ার মেয়েরা লেখাপড়া করতো না।

বিষয়টি জানতে পেরে ঋষিপাড়ার নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের মাধ্যমে ঋষিপাড়ায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের পর তিনি স্থানীয় সংরক্ষিত ইউপি সদস্যা আনোয়ারা বেগমের মাধ্যমে ঋষিপাড়ার ২৭৫টি পরিবারের ২৪০ জন নারীকে প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করেন।

গত ২০১৮ সালের ১ জুলাই ১২০ নারীকে নিয়ে প্রথম দফায় ৩ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তাদের পাটজাত দ্রব্য তৈরী, মোমবাতি তৈরী, নকশী কাঁথা সেলাই, টেইলারিং এবং পুঁথি দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রথম দফার প্রশিক্ষণ  শেষে  গত বছর বাকি ১২০ জনকে নিয়ে দ্বিতীয় দফার প্রশিক্ষণ শুরু হয়। জামালপুর জেলা থেকে দু’জন প্রশিক্ষক এনে তাদেরকে দুই দফায় ৬ মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

বর্তমানে দুই গ্রুপের নারীরা  প্রশিক্ষণ শেষ করে কাজ করা শুরু করেছে। তাদের উত্পাদিত পণ্য এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের জেল রোডে অবস্থিত নারী উন্নয়ন ফোরামের শো-রুম ‘অপরাজিতা’ নামক দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়াও শহরের বিভিন্ন মার্কেটের কাপড়ের দোকানে চাহিদা মতো সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে সীতানগরের ঋষিপাড়ার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় ঋষি সম্প্রদায়ের নারীরা বিভিন্ন ধরনের সেলাইয়ের কাজ ও মোমবাতি তৈরির কাজে ব্যসত্ম। ১১টি সেলাই মেশিনে তারা বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড়সহ ও বিভিন্ন ধরনের পাটের ব্যাগ তৈরি করছে। নারীদের কেউ কেউ তৈরি করছে মোমবাতি।

প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঋষিপাড়ার শরত্ ঋষির মেয়ে সুমিত্রা ঋষি জানায়, তার বাবা শহরের আনন্দ বাজারে শ্রমিকের (কুলি) কাজ করে। বাবার রোজগারে ঠিক মতো তাদের সংসার চলতো না। অভাবের কারণে লেখাপড়া করতে পারেনি। সুমিত্রা জানায়, প্রথম ধাপে সে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। বর্তমানে মহিলাদের থ্রি-পিস, সেলোয়ার, কামিজ ও ছোট বাচ্চাদের কাপড় তৈরি করে প্রতিদিন ভালো টাকা রোজগার করছে। তার রোজগারের কারণে তাদের পরিবারে এখন সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

একই কথা জানালেন প্রতীত ঋষির মেয়ে শাখা ঋষি। সে জানায়, তার পরিবারের ৭ জন সদস্য। বাবার রোজগারে সংসার চলে না। অভাবের কারণে পঞ্চম শ্রেণির পর সে আর পড়াশোনা করেনি। এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে সে  এখন স্বাবলম্বী। শাখা জানায়, সে ছেলেদের পাঞ্জাবি, ছোট বাচ্চাদের ফ্রকসহ বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড় ও মহিলাদের জন্য শাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজাইনের কাজ করে। শাখা জানায়, নিজেরা রোজগার করায় পরিবারে এখন তাদের সম্মান বেড়েছে।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সীতানগর গ্রামের ঋষিপাড়াটি অবহেলিত ছিল। এই পাড়ার পুরুষরা মুচির কাজ ও বিভিন্ন বাজারের কুলির কাজ করতো। মহিলারা ছিল অবহেলিত। পরিবারে মহিলাদের কোনো গুরুত্ব ছিল না। বিষয়টি জানার পর তিনি তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখানকার ২৪০ জন নারীকে তিনি দুই ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাদের জন্য অর্থের ব্যবস্থা করেন। তারা বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প, নকশী কাঁথা সেলাই, মোমবাতি তৈরি ও টেইলারিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন নিজেরা কাজ করতে পারছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় পরিবারে নারীদের গুরুত্ব বেড়েছে।