অনিশ্চয়তার মুখোমুখি ইউরোপের সংহতি

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ২২:১৬

 

জোরেশোরে চলছে ২৮ জাতি জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। আগামী বছর ২৯ মার্চের মধ্যে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে এ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ৬ জুলাই অবকাশকালীন সরকারি বাসভবন চেকার্স হাউসে দিনভর আলোচনা করে তিনি যে পরিকল্পনাটি স্থির করেছিলেন তা কদিন আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। এমপিদের সমর্থন অর্জনের বিষয়টি এখনো বাকি আছে। এরই মধ্যে দফায় দফায় পদত্যাগ শুরু করেছেন তার মন্ত্রীরা। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর অবস্থানে আছেন মে। তবে এটি পরিষ্কার যে ইইউ ছাড়ার পথে রয়েছে যুক্তরাজ্য। শেষ পর্যন্ত যদি ব্রেক্সিট নাও হয় তবে কাস্টোম ইউনিয়নের মধ্যে জোটের সঙ্গে একটি শিথিল বন্ধনের মাধ্যমে আবদ্ধ থাকতে পারে দেশটি।

এটি যখন একদিকের বাস্তবতা তখন অন্যদিকে ইতালি চেষ্টা করছে ইইউর নিয়ম ভঙ্গ করতে। ইতালি কাজটি করছে অনেকটা নিঃশব্দে। ইতালি চেষ্টা করছে মাত্রাছাড়া বাজেট ঘাটতি করে হলেও সরকারি ব্যয় বাড়াতে। যেটি ইইউ বিধি অনুমোদন করে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ২০১৫ সালে গ্রিস যেমন ঋণ সংকটে পড়েছিল ইতালি হয়ত সেদিকে যাত্রা করছে। সহজ কথায় বলতে গেলে ঋণ ভারে জর্জরিত হয়ে পড়লে ইতালির জন্য ইউনিয়নে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি ইতালি এটাও দেখানোর চেষ্টা করছে যে বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান বিবেচনায় রাখতে হবে। যেমন ভূমধ্যসাগরের ওপারের দেশ লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই ইতালি পরোক্ষভাবে এ বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করছে যে তাদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়লে তার প্রভাব একক মুদ্রা ব্যবহারকারী দেশগুলোর জোট ইউরোজোনে পড়বে। কয়েক দশক তেজি থাকার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালির অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। ইতালির রাজনীতিতেও তাই ইইউ বিরোধী বাগাড়ম্বরকারীরা সুবিধা করতে পারছেন। এক্ষেত্রে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উভয়েরই আনুকূল্য পাচ্ছেন। কারণ ওই দুই নেতাই ইইউকে তাদের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করেন।

ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক টালমাটাল সময় এখন পার হচ্ছে। গত চার বছরে দেশটিতে তিনটি নির্বাচন হয়েছে। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট, ১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ অথবা থাকা প্রশ্নে গণভোট এবং গত বছর (আগাম) সাধারণ নির্বাচন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে সর্বশেষ রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত আরেকটি সাধারণ নির্বাচনের পথ সুগম করতে পারে। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা একটি পরিচ্ছন্ন ব্রেক্সিট চাইছেন। মে’র নতুন পরিকল্পনাটি কাজে আসবে না বলে নিজ দলের এমপি ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন। মে মনে করেন ইউরোপীয় একক বাজার ও কাস্টোম ইউনিয়ন ছাড়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন তার ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষমতা ব্রাসেলস থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরত আসবে। মে’র ওই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার পর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মীদের ব্রিটেন ও ইইউতে অবাধে আসা-যাওয়ার সুযোগ থাকবে। ভ্রমণ ও স্বল্পকালীন কাজের জন্য ইইউ নাগরিকদের ব্রিটেনে যেতে ভিসা লাগবে না। ইইউ নাগরিকেরা অবাধে ব্রিটেনে পড়াশোনার জন্য যেতে পারবে। এরপর দুই বছর অন্তর্বর্তী সময় থাকবে। তবে বোলস মনে করেন দুই বছর অন্তর্বর্তীকালীন সময় রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি চান এর পরিবর্তে ব্রিটেন তিন বছরের ইউরোপীয় ইকনোমিক এরিয়ার অংশ হবে।

জুলাইতে মে’র তথাকথিত চেকার্স পরিকল্পনা প্রণয়নের পরপরই প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। জাতীয়তাবাদী ধ্যান ধারণার জন্য জনসন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্রিটিশ সংস্করণ হিসেবে পরিচিত। জনসনের পথ ধরে মন্ত্রীদের পদত্যাগের ধারা এখনো চলছে। জনসনের ভাই জো জনসনও মে’র মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, তিনি নভেম্বরের প্রথম দিকে পদত্যাগ করেছেন। তাদের সবার বক্তব্য মোটামুটি একই, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্রিটেনের অবস্থা হবে ইইউর একটি উপনিবেশের মতো।

এবার পূর্ব ইউরোপের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির রাজনীতিতে উগ্র ডানপন্থিদের উত্থান ঘটেছে। কেবল পূর্ব ইউরোপ নয় ইতালি ও ফ্রান্সের রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব স্পষ্ট। এরা মূলত অভিবাসী ও সর্ব ইউরোপীয় সংহতির বিরোধী। ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিক মেরি লিপেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচন সামনে রেখে দল প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তার দল ন্যাশনাল র্যালির (সাবেক নাম ন্যাশনাল ফ্রন্ট) ডানপন্থি সদস্যদের অভিবাসী বিরোধী বক্তব্য অনেক ভোটারের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লিপেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোর কাছে শোচনীয়ভাবে হারেন। তখন তার দলের জনসমর্থন ছিল ২০ শতাংশ। এখন তা ২৫ শতাংশ বলে জানা গেছে।

এই মুহূর্তে ম্যাক্রো এবং জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেলই ইউরোপীয় সংহতি অটুট রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আছেন। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে ইউরোপীয় ঐক্য ও সংহতি কি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ব্রাসেলসে ইইউ কর্মকর্তারা এখনো পর্যন্ত ঐক্য ধরে রাখার আশাবাদী। ইতিহাস অবশ্য সর্ব ইউরোপীয় ধারণার অনুকূলে নয়। ইতিহাসে ইউরোপের দেশগুলো কখনোই বর্তমান সময়ের মতো একে অন্যের এতটা কাছাকাছি ছিল না।