ছোটবেলা থেকেই ইলেকট্রনিক্সের ব্যাপারে দারুণ আগ্রহী চট্টগ্রামের হাটহাজারির এই তরুণ। ঘরে ব্যবহূত কোনো জিনিস নষ্ট হলে তা খুলে ঠিক করতেন বাবা—এ দেখেই তার আগ্রহটা জন্মে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই জয় নিজেও মন দেন নতুন কিছু তৈরিতে।
বলছিলাম চট্টগ্রামের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইলেকট্রনিক্সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অধ্যয়নরত জয় বড়ুয়া লাভলুর কথা। প্রকৌশলে পড়াশোনায় সবেমাত্র চতুর্থ সেমিস্টারে পড়লেও তার উদ্ভাবনের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। হাটহাজারির জোবরা পিপি স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময় লাভলু পরিচিতজনদের কাছে পরিচিত ছিলেন খুদে বিজ্ঞানী হিসেবে। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ই তৈরি করেছেন রোবট।
মফস্বলে থেকে কোনো প্রকার বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই এত অল্পবয়সে নানা যন্ত্রের উদ্ভাবন করেছেন লাভলু—এটা বললে শুরুতে যে কেউ পুরোপুরি বিশ্বাস নাও করতে পারেন। তবে প্রমাণ মিলল ইউটিউবে লাভলুর নিজের চ্যানেলের কিছু ভিডিওতে। ছোট একটি রোবট হেঁটে যাচ্ছে, যেখানে ময়লা দেখছে সেখানে দাঁড়িয়ে ময়লাটা সংগ্রহ করে পিছনে থাকা ব্যাগে ভরে নিচ্ছে—এটা তৈরি করেছেন লাভলু। এছাড়া স্বল্পমূল্যে তৈরি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, রিমোট কন্ট্রোলড বিভিন্ন যন্ত্র, দ্রুত ছবি আঁকার জন্য অন্যরকম কলমসহ বিভিন্ন উদ্ভাবনের নমুনা দেখা গেল। মানুষের মতোই দেখতে একটা রোবট আছে লাভলুর তৈরি, যেটা চোখের পলক ফেলতে ও মুখ নাড়াতে সক্ষম। হাত-পাও নাড়াতে পারে রোবটটি। এসব দেখে জানা গেল, রোবটের ব্যাপারে তার আগ্রহ অনেক আগে থেকেই। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরে বিভিন্ন সময়ে উন্নত দেশগুলোর তৈরি বুদ্ধিমান রোবটের চিত্র দেখে এ ব্যাপারে আগ্রহ বাড়ে তার। আর তাই সবসময় খুঁটিনাটি যন্ত্রাংশ নিয়ে লেগে থাকেন কিছু না কিছু তৈরির চেষ্টায়।
সম্প্রতি ‘থার্ড হ্যান্ড’ নামে একটি রোবটিক হাত তৈরি করেছেন লাভলু। এটি মানুষের হাতের মতোই নড়তে পারে। যেকোনো দিকে ঘোরানো, মুষ্টিবদ্ধ করা, যেকোনো জিনিস ধরে উপরে তোলার কাজ করা যায় এই রোবটিক হাতের মাধ্যমে। লাভলুর মতে, যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার, তাদের জন্য এটা খুবই উপকারী হতে পারে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ পড়েছে হাতটি তৈরি করতে। এতে বেশকিছু সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পায়ের আঙুলের সাহায্যে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যার হাত নেই, সেও এটি ব্যবহার করতে পারবে। আবার অনেক সময়ই হাই-ভোল্টেজ ইলেকট্রিকসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ‘তৃতীয় হাত’ দরকার হয়, সেক্ষেত্রেও এটি উপকারী হবে।
জানা গেল, প্রতিটি কাজের পিছনেই লাভলুর উদ্দেশ্য হলো, কম খরচে তৈরি করা এসব যন্ত্র যেন সাধারণ মানুষের কাজে লাগে। রোবটিক হাতের মতো প্রযুক্তি যেন দরিদ্র মানুষও স্বল্পমূল্যে কিনে ব্যবহার করতে পারেন। মানুষের উপকারে এলেই তার এই প্রচেষ্টা সফল হবে বলে আশা তার।
নিজের উদ্ভাবনী মেধার স্বীকৃতি হিসেবে এরমধ্যে বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছেন জয় বড়ুয়া লাভলু। কিছুদিন আগে ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আবিষ্কারের নেশায়’ নামক প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট রানারআপের পুরস্কার পান লাভলু। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওই প্রতিযোগিতায় রোবটিক হাতটি প্রদর্শন করেন তিনি। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতা, চট্টগ্রাম ও হাটহাজারিতে স্থানীয়ভাবে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলা ও বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
জয় বড়ুয়া লাভলু জানালেন, পরিবারে কিছুটা আর্থিক অনটন থাকায় ইচ্ছা থাকলেও অনেক কাজ করা সম্ভব হয় না। এজন্য পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তবে পরিবারের সদস্যরা সবসময় তাকে উত্সাহ দেন, কাজে সহযোগিতা করেন। তারা প্রত্যাশা করেন লাভলু একদিন বড় বিজ্ঞানী হবেন।
