আগুন ট্রাজেডির জন্য পুরাতন ঢাকার কুখ্যাতি বাড়িয়া চলিয়াছে। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া পুরাতন ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা হইতে ভয়াবহ অগ্নিকা্লের ঘটনা ঘটিতেছে।
কিন্তু ইহার কোনো প্রতিকার হইতেছে না। সেখানে এখনো রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা রহিয়াছে বহাল তবিয়তে।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে সাময়িক সময়ের জন্য আমাদের টনক নড়ে। কিছু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ঝরে এবং কিছুদিন চলে রুটিন অভিযান। তাহার পর আগের চালচিত্রেই ফিরিয়া যায় পুরাতন ঢাকা। কিছুদিন যাইতে না যাইতেই আগুন ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই যেমন গত মঙ্গলবার চকবাজারের একটি প্লাস্টিক গোডাউনে অগ্নিকা্লের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরিয়া চেষ্টা করিয়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি তেমন হয়তো হয় নাই, তবু এক একটি অগ্নিকা্ল আমাদের সতর্ক করিয়া দিতেছে। কিন্তু প্রশাসনের ঘুম ভাঙিতেছে না। রাসায়নিক ও প্লাস্টিক কারখানাগুলি আবাসিক এলাকা হইতে সরাইবার কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। গত ১২ বত্সরে পুরাতন ঢাকায় অগ্নিকা্লে ঝরিয়াছে দুই শতাধিক প্রাণ। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকা্লে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনে মারা যান ৭১ জন। এই বত্সর আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানসনের অগ্নিকা্লে মারা গেল ৪ জন। এত বিপজ্জনক ও নির্মম স্মৃতি আমাদের সম্মুখে সর্বদা ভাসিয়া উঠিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন নির্বিকার ও নির্লিপ্ত।
পুরাতন ঢাকায় রাসায়নিক ও প্লাস্টিক কারখানা বা গুদামগুলি কী করিয়া সবার নাকের ডগায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতেছে, তাহাই বিস্ময়কর। কেননা এইগুলির না আছে কোনো বৈধতা, না আছে বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র। এইগুলি দেখাশুনার জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা রহিয়াছে। কিন্তু বেআইনি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া কাজ করিয়া যায়? এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইয়া গিয়াছে যে ইহা বলিয়া তেমন কোনো লাভও নাই।
এখন হয় জনগণকে সোচ্চার হইতে হইবে অথবা নিষ্ক্রিয় থাকিয়া দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে। যদি বেআইনি প্রতিষ্ঠান বন্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহা হইলে কোনো অগ্নিকা্ল ঘটিলে কেন আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়? নিমতলী ও চুরিহাট্টা ট্রাজেডির পর তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করিয়াছিল, তাহা এক যুগেও বাস্তবায়ন করা হয় নাই। তাহা হইলে লোকদেখানো তদন্ত কমিটি করিয়া কী লাভ? জানা মতে, পুরাতন ঢাকায় এখন রাসায়নিক ব্যবসা রহিয়াছে ১ হাজার ২০০ ব্যবসায়ীর। রাসায়নিকের ধরন প্রায় পাঁচ হাজার।
ইহার মধ্যে কিছু রাসায়নিক অতিদাহ্য। এখানে প্লাস্টিকের কারখানা ও গুদাম রহিয়াছে প্রায় এক হাজার। আবাসিক এলাকা হইতে এইগুলি সরাইতে না পারিলে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাগত ঝুঁকি বাড়িতেই থাকিবে। এই সংক্রান্ত ট্রাস্কফোর্সের প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর কেরানীগঞ্জে একটি রাসায়নিক শিল্পকারখানা গঠনের জন্য একনেকে প্রকল্প গৃহীত হয়।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জে ৩১০ একর জমিতে রাসায়নিক শিল্পপল্লী প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। টঙ্গী ও শ্যামপুরে অস্থায়ী দুইটি গুদাম নির্মাণের কথাও বলা হয়। এখন এইসব উদ্যোগের অগ্রগতি কতটুকু-তাহা লইয়া আমরা কি ভাবিতেছি?
কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতির পরও জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না হইলে জনগণকে বসিয়া থাকিলে চলিবে না। জনগণ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন না হইবেন, ততদিন তাহাদের ভাগ্যোন্নয়ন হইবে না। যে কোনো অন্যায়-অনিয়ম-অপকর্মের বিরুদ্ধে তাহাদের রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। দুর্ভোগ-দুর্দশা লাঘবে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করিতে হইবে।
দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া যাইবার পরও যদি জনগণ ঘুরিয়া না দাঁড়ায়, তাহা হইলে যতই চিত্কার-কান্নাকাটি করা হউক না কেন, প্রতিকার সহজে মিলিবে না।
