বিগত ৫০ বৎসর ধরিয়া সকল জামানাতেই বেশ গালভরা একটি বুলি আউড়ানো হয় যে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হইবে।’ কিন্তু নির্বাচনে কত ধরনের সহিংসতা হইতে পারে, তাহার যেন নূতন নূতন দৃষ্টান্ত আমরা দেখিতে পাইতেছি। স্পষ্টতই সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় দেশব্যাপী চলমান ইউপি নির্বাচনে সংঘর্ষ ও খুনখারাবি লইয়া অসংখ্য সংবাদ নিয়মিত প্রকাশ পাইতেছে।
খবরে বলা হইতেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীতে নাকাল আওয়ামী লীগ। এমনকি বিদ্রোহী প্রার্থীর তোড়ে বৃদ্ধি পাইয়াছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপে ১০০৩ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার ২৮৫ জনের মনোনয়নপত্র জমা পড়িয়াছে। সেইখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা দলীয় প্রার্থীর দ্বিগুণ! এইবারের ইউপি নির্বাচনের ব্যাপক সহিংসতা দেখিয়া উহা নিয়ন্ত্রণে বৈঠকও ডাকিয়াছে নির্বাচন কমিশন।
সমস্যা হইল, দলীয় মার্কায় ইউপি নির্বাচন হইলেও মাঠে তো এখন কোনো বিরোধী দল নাই। অর্থাৎ নিজেদের মধ্যেই নিজেদের মারামারি চলিতেছে। এই গৃহদাহ কীভাবে নির্বাপিত করা যাইবে? এই কারণে সম্প্রতি দলের হাইকমান্ড হইতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া বলা হইয়াছে—যাহারা বিদ্রোহ করিতেছে, তাহাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হইবে। বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করিলেও দল তাহাকে আর মনোনয়ন দিতেছে না, দল হইতে বহিষ্কার করা হইতেছে। তাহার পর অবশ্য বলা হইতেছে—এখন দলের বাহিরে গিয়া যদি কেহ নির্বাচন করে, তাহা হইলে দলের তো আর কিছু করিবার নাই। এমতাবস্থায় বাস্তবতা হইল, বিদ্রোহী হইয়া যাহারা যেইভাবেই হউক শেষাবধি জয়লাভ করিতেছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দল তাহাদের পুনরায় সাদরে গ্রহণ করিয়া ঘরে ফিরাইয়া নেয়।
প্রশ্ন হইল—যাহারা বিশৃঙ্খলা করেন, হাইকমান্ডের নির্দেশ অমান্য করেন, চরম ঔদ্ধত্য দেখান, তাহাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ যদি করা সম্ভবই না হয়, তাহা হইলে বলিবার দরকার কী যে—কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে? এই ‘কঠোর ব্যবস্থা’ গ্রহণ না করিবার চিত্র যদিও নূতন নহে। অর্ধশতক ধরিয়া বিভিন্ন জমানাতেই আমরা এইভাবে নির্বাচনকে হাস্যকর পর্যায়ে অবনত হইতে দেখিয়াছি। ৫০ বৎসরে ইহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করিবার কারণেই নির্বাচন ক্রমশ হাস্যকর পর্যায়ে চলিয়া যাইতেছে। আর এইভাবেই যদি সকল কিছু পরিচালিত হয়, তাহা হইলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করিবার দরকারটা কী? প্রহসনের নির্বাচনের কি কোনো মানে হয়? পরিতাপের সহিত বলিতে হয়—যাহা করা যায় না, যাহা উচিত নহে, যাহা শিক্ষা-ভদ্রতা ও মার্জিত রুচির সহিত যায় না—তাহারই অনেক ধরনের ঘটনা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে দেখিতে পাওয়া যাইতেছে।
বিশ্বের স্বনামধন্য কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলিতেছে, নির্বাচন কারচুপির মেকানিজমটা উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু দেশ খুব ভালোভাবে আয়ত্ত করিয়া ফেলিয়াছে। শাসকদলের কর্মীরা প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নির্বাচন কমিশনের সহিত যোগসাজশের মাধ্যমে নির্বাচনকে নিজের মতো সাজাইতে পারেন। এই কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বে সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্ভয়ে ভোট প্রদান এবং নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন বহু ক্ষেত্রেই অকল্পনীয় হইয়া পড়ে। এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনের জন্য নহে, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক।
এখন এই সমস্যা হইতে উন্নয়নশীল বিশ্বের সেই সকল দেশ কী করিয়া মুক্তি পাইবে? সামাজিক, পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত কারণে প্রশাসনে যাহারা থাকেন, সরকারের উপর তাহাদের নির্ভর করিবার বিষয়টিও শীঘ্র ঠিক হইবার নহে। অনেকে মনে করেন, ইহা হইতে মুক্তি পাইতে জনগণকেই সংঘবদ্ধ হইয়া আগাইয়া আসিতে হইবে। শেষ ভরসা জনগণই। কারণ এই দেশটি তো তাহাদের। দুঃখজনকভাবে এই ধরনের বিপ্লব ও আন্দোলনে যেই লোকক্ষয়, রক্তক্ষয় হইবে—তাহার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না।
