সামরিক বাহিনীর পোশাক সহজলভ্য হলে নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৫৯

কম্ব্যাট পোশাকের প্রতি আকর্ষণ নেই, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আপাতদৃষ্টিতে কম্ব্যাট পোশাক জলপাই রঙের মনে হলেও, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কম্ব্যাট পোশাক খাকি, কালো, সবুজ ও মেরুন—এই চারটি রঙের সংমিশ্রণ। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে শত্রুর চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এবং পারিপার্শ্বিক সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে যেতেই বা ছদ্মবেশ ও গোপনীয়তা রক্ষার্থে মূলত এই কম্ব্যাট পোশাকের চল শুরু হয়।

আবার মরুভূমির ধূসর প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই কম্ব্যাট পোশাকও রয়েছে, যার রং সবুজের পরিবর্তে ধূসর-খাকি এবং অন্যান্য হালকা রঙের সংমিশ্রণ। তবে সবার কাছে কম্ব্যাট পোশাকের মূল আকর্ষণ এর জলপাই রংসহ মিশ্র রং, এর নকশা, ছাপা ও ডিজাইন। শান্তিকালীন সৈনিকগণ কর্তব্যরত অবস্থায় ও প্রশিক্ষণকালীন সামরিক পোশাক—কম্ব্যাট ড্রেস পরিধান করে। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অথবা কোনো অপারেশন কিংবা প্রশিক্ষণ ও ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার ডিউটিতে কম্ব্যাট পোশাকের সঙ্গে ওয়েব ইকুইপমেন্ট পরিধান করে, যাকে ‘স্কেল এ/স্কেল বি’ বলা হয়। এছাড়া সামরিক বাহিনীর রয়েছে ওয়ার্কিং ড্রেস, সেরেমনিয়াল ড্রেস, ফরমাল ড্রেস, সার্ভিস ড্রেস ইত্যাদি ভিন্ন নামের, বর্ণের ও ডিজাইনের।

প্রাচীন আমল থেকে বিশ্বের নানা দেশে, অঞ্চলে, বিভিন্ন গোত্রের যোদ্ধাগণ, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধের প্রয়োজনে বাহারি রঙের পোশাক বা ইউনিফর্ম পরিধান করত। তবে বিশ্ব জুড়ে সর্বাধিক ব্যবহার্য সামরিক ইউনিফর্মের রং ছিল ‘খাকি’। তারপর অলিভ গ্রিন, এরপর এলো মিশ্র রঙের কম্ব্যাট ইউনিফর্ম। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রথম ড্রাব কটন ইউনিফর্ম পরিধান করে। ১৮৪৮ সালে কোর অব গাইডস দ্বারা প্রথম হালকা-বাদামি রঙের ইউনিফর্ম ব্যবহৃত হয়, যা ‘ভারতীয় সেনা খাকি’ নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য ইম্পেরিয়াল এবং কমনওয়েলথ দেশগুলোর সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য যে পোশাক এবং ব্যাটেল ড্রেস (বিডি) ব্যবহার করত, তা ‘৫ নম্বর ড্রেস’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৬০-এর দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত তারা এই পোশাক পরিধান করত।

এছাড়া রাজকীয় এয়ার ফোর্স ‘আকাশী নীল’, এবং রাজকীয় নৌবাহিনী ‘নেভি ব্লু’ রঙের যুদ্ধ পোশাক পরিধান করত। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী তার ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধের ইউনিফর্ম ব্যবহার করেছে, এর মধ্যে ওজি ১০৭, ব্যাটেল ড্রেস ইউনিফর্ম, এয়ারম্যান ব্যাটেল ইউনিফর্ম, আর্মি কম্ব্যাট ইউনিফর্ম, নেভি ওয়ার্কিং ইউনিফর্ম এবং মেরিন কোর কম্ব্যাট ইউটিলিটি ইউনিফর্ম ইত্যাদি। অনেক দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছদ্মবেশী এবং কম্ব্যাট ইউনিফর্ম তৈরি করেছিল, প্রাথমিকভাবে কেবল ‘অভিজাত’ ইউনিটের জন্য এবং পরে ধীরে ধীরে গোটা বাহিনী এই ইউনিফর্ম পরিধান করে। সবুজ রঙের কম্ব্যাট ইউনিফর্ম ১৯৬০-এর দশক থেকে সর্বজনীন ব্যাটল ড্রেসে পরিণত হয়। তবে এখন প্রায় সব দেশের সামরিক বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনী সবুজ, ধূসর ও কাছাকাছি মিশ্র রঙের, ঢঙের নকশা ও ছাপার কম্ব্যাট ইউনিফর্ম ব্যবহার করে।

একটা সময় ছিল যখন শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যে স্থলবাহিনী বা সেনাবাহিনী কম্ব্যাট পোশাক পরিধান করত। বাংলাদেশেও প্রথম সেনাবাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী কম্ব্যাট কিংবা মিশ্র বর্ণের পোশাক পরিধান করত না। পরবর্তী সময় নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, আনসার, বিজিবি, এমনকি পুলিশের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং ফায়ার ব্রিগেডের সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের মিশ্র রঙের কম্ব্যাট পোশাক ব্যবহার শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে যেসব বাহিনীর যুদ্ধকৌশলের অংশ অথবা প্রশিক্ষণের জন্য কিংবা স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে কম্ব্যাট পোশাকের প্রয়োজন নেই, তারাও কম্ব্যাট পোশাক পরিধানে আগ্রহ প্রকাশ করল, ব্যবহার শুরু হলো বাহারি রঙের কম্ব্যাট পোশাকের। যদিও কেউ কেউ সামরিক বাহিনীর কম্ব্যাট পোশাক ছাড়া অন্যান্য বাহিনীর ব্যবহৃত কম্ব্যাট পোশাককে কম্ব্যাট না বলে মিশ্র রঙের পোশাক বলে থাকেন। এছাড়াও কোনো কোনো প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির গার্ডরা অনেক ক্ষেত্রে কম্ব্যাট পোশাকের মতো পোশাক ব্যবহার করছে। বাজারে নানা রঙের কম্ব্যাট গেঞ্জি, ট্রাউজার বিক্রয় হয় বলে কিশোর-তরুণদের মধ্যে অনেককেই ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

কম্ব্যাট পোশাকের এই অযাচিত ব্যবহার অনেক সামরিক যোদ্ধা, বয়োজ্যেষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের কাছে পছন্দনীয় নয়, তারা মনে করেন, এই পোশাক অত্যন্ত গর্বের, গৌরবের এবং সম্মানের, যা পরিধানে যোগ্যতা লাগে। তবে সব বাহিনীর কম্ব্যাট পোশাক ব্যবহারের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা ভাবা দরকার। তাছাড়া নিরাপত্তার জন্য এই নিয়ন্ত্রণহীন কম্ব্যাট পোশাক ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিটি বাহিনীই তার নিজস্ব দায়িত্ব কর্তব্যের আলোকে পোশাকের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য থাকবে। যেজন্য কম্ব্যাট পোশাকের চল শুরু হলো সেই যুদ্ধ, প্রশিক্ষণ, রণকৌশলই যদি কারো জন্য প্রযোজ্য না হয়, তাহলে তাদের কম্ব্যাট পোশাকেরও প্রয়োজনীয়তা নেই। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি কিছু বাহিনী বিভিন্ন ধরনের মিশ্র রঙের কম্ব্যাট ইউনিফর্ম পরিধান করে, যাদের অধিকাংশই জঙ্গলে অথবা পাহাড়ে দায়িত্ব পালন করে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

কম্ব্যাট পোশাক ব্যবহারে কিছু নিয়মকানুন, বিধিনিষেধ রয়েছে। অ-অনুমোদিত ব্যক্তি কর্তৃক কম্ব্যাট ইউনিফর্ম এবং মিলিটারি সরঞ্জামাদি ব্যবহার নিয়ম পরিপন্থী। এসব দ্রব্যাদি খোলাবাজারে বিক্রয় নিষিদ্ধ। তাছাড়া সেনানিবাস-সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত আর্মি স্টোরগুলোতে ইউনিফর্মের সাথে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি বিক্রয় করতে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়; কিন্তু ইউনিফর্মের কাপড় বিক্রয় করা নিষিদ্ধ। আর্মি স্টোরগুলোকে নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রাপ্তিসাপেক্ষে নিকটস্থ স্টেশন সদর দপ্তর কর্তৃক তালিকাভুক্ত হতে হয়। তাছাড়া এসব দোকানের ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং তদারক করা হয়। উল্লেখ্য যে, অ-অনুমোদিত ব্যক্তি কর্তৃক 

কম্ব্যাট ইউনিফর্ম ও সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে প্রাথমিকভাবে তা সামরিক বাহিনীর সদস্যের কাজ বলে প্রচার হতে পারে। তাতে সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া সব বাহিনীই যদি বিভিন্ন রংঢঙের কম্ব্যাট পোশাকই ব্যবহার করে, তবে কে কোন বাহিনী তা বোঝা অনেকের জন্য দায়। অধিকন্তু কম্ব্যাটের রং আলাদা হলেও কোনো কোনো বাহিনীর কম্ব্যাটের রং কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তাছাড়া বিদ্রোহী গ্রুপ, সন্ত্রাসীরা গোপনে কম্ব্যাট ব্যবহার করে তাদের নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। সামরিক পোশাক বা কম্ব্যাট ড্রেস সহজলভ্য হলে শত্রু-সন্ত্রাসীরা এই পোশাক পরিধান করে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সহজে প্রবেশ করে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে পারে, যা নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাই কম্ব্যাট পোশাক আকর্ষণীয় হলেও এর ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপসহ এর নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।

লেখক: কর্নেল অ্যাডমিন, এএসসি সেন্টার অ্যান্ড স্কুল 

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন