উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির প্রগতির পথে নানাবিধ বাঁধা বিপত্তি আসিয়া থাকে, ইহা কাহারো অজানা নহে। তবে তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হইল, এই সকল দেশগুলির উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে সবচাইতে বড় বাঁধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে মিথ্যাচার। উন্নয়নশীল বিশ্বে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় হইতে শুরু করিয়া একেবারে নিম্নতম পর্যায় পর্যন্ত মিথ্যাচারের যে মহামারী শুরু হইয়াছে—তাহা আমাদের না ভাবাইয়া পারে না। দেখা যায় দায়িত্বশীল পদে যাহারা রহিয়াছেন তাহারা সঠিক ও সত্য কথাটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বলিতেছেন না, সত্যকে আড়াল করিয়া অবলীলায় মিথ্যার মহাকাব্য রচনা করিয়া ফেলিতেছেন। নিজ পরিবার হইতে শুরু করিয়া অফিস, আদালত, শিল্প-কারখানা এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতেও মিথ্যাচারের ছড়াছড়ি। দিনে দিনে সবাই মিথ্যার রাজ্যে ডুবিয়া যাইতেছে, মিথ্যা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে যে, ইহা যেন মানুষের অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হইয়াছে। মিথ্যার এই মহোত্সব চলিতে থাকিলে একসময় নিজ পরিবার, অফিস আদালত, শিল্পকারখানা হইতে শুরু করিয়া সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করাও দুরূহ ব্যাপারে পরিণত হইয়া যাইবে।
মিথ্যাকে বলা হইয়া থাকে সকল পাপের জননী। একটি মিথ্যা হইতে শতশত পাপের সূত্রপাত হয়। দুঃখজনক বিষয় হইল মিথ্যাচার পাপ কিংবা সর্বজনস্বীকৃত ঘৃণ্য কাজ হওয়া সত্ত্বেও অনেকে জানিয়া শুনিয়া মিথ্যা কথা বলিয়া বেড়ায়। কেহ নিজ পরিবারেই মিথ্যার আশ্রয় লইয়া থাকে, কেহ অফিস আদালত কিংবা নিজ কর্মক্ষেত্রে সত্যকে লুকাইয়া মিথ্যাচার করিয়া থাকে। আবার উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে যাহারা দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন তাহারা নিজেদের সাফল্য তুলিয়া ধরিতে মিথ্যাচারের আশ্রয় লয়। মিথ্যার এই অপসংস্কৃতি দুর্নীতিকে প্ররোচিত ও উত্সাহিত করিয়া থাকে। দেখা যায় এই সকল দেশগুলিতে বিভিন্ন পরিসংখ্যান হইতে শুরু করিয়া অর্জন-ব্যর্থতার যেই হিসাব নিকাশ তুলিয়া ধরা হয় তাহাতে সত্যকে আড়াল করা হয়।
সরকারি হিসাব নিকাশ, পণ্যের মজুদ-ঘাটতি ইত্যাদি সকল কিছুতেই থাকে অবাধ মিথ্যাচার। দেশের শিল্পোত্পাদনের জন্য অপরিহার্য বিদ্যুত্ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ লইয়াও পরিলক্ষিত হয় এক প্রকার মিথ্যাচার। অথচ প্রতিটি ধর্মেই মিথ্যাচারকে ঘৃণা ও তিরস্কার করা হইয়াছে, মিথ্যা কথা বলা হইতে বিরত থাকিতে বলা হইয়াছে।
পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তাআলা এরশাদ করিয়াছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করিও না এবং জানিয়া শুনিয়া সত্য গোপন করিও না।’ (সূরা বাকারা : আয়াত ৪২)। প্রকৃতপক্ষে মিথ্যার অসারতা মানবতাকে কলুষিত করে এবং উহা অকল্যাণের পঙ্কিলতায় মানুষকে ডুবাইয়া দেয়। আবার উন্নয়নশীল বিশ্বে দায়িত্বশীলদের অনেকেরই কথা ও কাজের মধ্যে বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হয়—যাহা মিথ্যাচারেরই শামিল। ইহা মুনাফিকির বৈশিষ্ট্যও বটে। হাদিসে বর্ণিত রহিয়াছে মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি—যখন সে কথা বলে তাহা মিথ্যা বলে, ওয়াদা করিলে তাহা ভঙ্গ করে এবং আমানতের খিয়ানত করে। মিথ্যা ও মুনাফিকির বিস্তৃতি বিশ্বব্যাপী। কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কগণও প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর সঙ্গে মিথ্যাচার করিয়া থাকে। এশিয়ার একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অমীমাংসীত বিষয় লইয়া উন্নত বিশ্বের প্রভাবশালী দুইটি দেশের দ্বন্দ্ব যেইখানে প্রায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি করিয়াছিল, সেইখানে জলবায়ু ইস্যুতে তাহাদের একই সুর বিশ্ববাসীকে ধন্দে না ফেলাইয়া দেয়। ইহাও কি প্রবঞ্চনা নহে?
সত্যকে আড়াল করিয়া মিথ্যাচারের মাধ্যমে চিরকাল টিকিয়া থাকা যায় না। মিথ্যাচারের মাধ্যমে জনগণকে ঠকানো যায় বটে, কিন্তু দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া গেলে তাহারা প্রতিবাদী হইবেই। স্মরণ রাখিতে হইবে, এই ধরনের পরিস্থিতি মানুষ চাহিয়া চাহিয়া দেখিবে না। দিনের পর দিন এই রকম পরিস্থিতি চলিতে থাকিলেই চে গুয়েভারা, বুমেদিন, বাঘা যতীন, সূর্য সেনদের ন্যায় বিপ্লবীদের আগমন অত্যাসন্ন হইয়া পড়ে। ইহাও উন্নয়নশীল দেশগুলির মনে রাখা দরকার।
ইত্তেফাক/বিএএফ
