নিজেরা শান্তিতে থাকুন, অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিন

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২১, ২১:৩৮

এককালে যাহাদের অঢেল প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধ জীবন ছিল, তাহাদের আজ পথের ভিখারি আর উদ্বাস্তু বানাইয়া সহানুভূতি দেখানো হইতেছে। কথায় আছে—‘ভিক্ষা চাহি না, কুত্তা ঠেকাও।’ সেই যে ঈশপের বিখ্যাত একটি রূপকথা আছে—সিংহের হরিণ খাইতে সাধ হইল, তখন শিয়াল সিংহকে বলিল, হরিণকে সিংহাসনে বসাইবার লোভ দেখাইলে শিয়াল আপনার নিকট আসিবে আর তখন আপনি তাহার ঘাড় মটকাইয়া খাইবেন। শিয়ালের বুদ্ধিমতো হরিণ সিংহের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসিবার লোভে দুরুদুরু বুকে সিংহের কাছে গেল, আর তখনই সিংহ তাহাকে থাবা দিয়া বসিল। হরিণ সতর্কই ছিল, সিংহ থাবা দিতেই লাফ দিয়া পালাইল, শুধু তাহার কান কাটিয়া গেল। শিয়াল আবার বুঝাইল, ‘আরে তোর কান ধরিয়া কিছু রাজকাজের জ্ঞান দিবেন সিংহ মহারাজ। রাজা হওয়া কি এতই সোজা?’ হরিণের মন গলিল, রাজজ্ঞান লইতে আবার সিংহের নিকট গেল এবং সিংহ এইবার অতি সহজে হরিণের ঘাড় মটকাইয়া খাইল। 

এই পৃথিবীর কিছু সাদা সিংহ নিজেদের মতো করিয়া শান্তিতে বসবাস করা হরিণদের নিকট গণতান্ত্রিক-রাজজ্ঞান প্রদান করিতে চাহিল। এইভাবে সেই সাদা সিংহরা নিরীহ হরিণ নেতাদের হত্যা করিল, আর বাকি হরিণরা যখন কথিত গণতান্ত্রিক ঘূর্ণিঝড়ে এইদিক-ঐদিক ছিটকাইয়া পড়িল। তখন তাহাদের বলা হইল উদ্বাস্তু, ভিখারি; কিন্তু কেহ স্পষ্ট করিয়া বলিতেছে না—কেন তাহাদের উদ্বাস্তু হইতে হইল? কেন তাহাদের অন্যদেশের সীমান্তে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে পড়িতে হইল? তাহারই খণ্ডচিত্র আমরা প্রায়শই দেখিতে পাইতেছি, যাহা এখন দেখা যাইতেছে বেলারুশ-পোল্যান্ড সীমান্তে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, কথিত গণতন্ত্র রপ্তানির নামে বিশ্বব্যাপী নানান মাত্রার অস্থিরতা ক্রমশ মাকড়শার জালের মতো ছড়াইয়া পড়িতেছে। কোথাও যুদ্ধবিমান উড়িতেছে, কোথাও খাদ্য ও অর্থের আকাল দেখা যাইতেছে। বলা যায়, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক অস্থিরতা হইতে বিশ্বের কোনো দেশই এখন আর মুক্ত নহে। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ দিয়া। আর তাহার পর সতর্ক করিয়াছেন বাড়াবাড়ি না করিতে। একজনকে আরেকজনের মতো হইবার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখিবার বিষয়েও স্পষ্ট নিষেধ করা হইয়াছে। প্রত্যেকেই তাহার কর্ম অনুযায়ী ফল পাইবে। কাহারো কর্মই বৃথা যাইবে না। ভালো কর্মের ভালো ফল এবং খারাপ কর্মের খারাপ ফল মিলিবে নিশ্চয়ই; কিন্তু চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি। তাহারা পায়ে পাড়া দিয়া ঝগড়া বাধাইতে চাহে, পানি ঘোলা করিয়া মাছ মারিতে চাহে। এই মোড়লদের জন্যই পৃথিবীতে আজ এত অশান্তি। ইহারাই বিশ্বব্যাপী তৈরি করিতেছে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। 

কোথাও কোথাও গণতন্ত্র রপ্তানি করিয়া প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে কথিত গণতন্ত্র কায়েম করিবার ঘটনাও দেখা যায়; কিন্তু গণতন্ত্র মানে কি শুধু ভোট? গণতন্ত্রে অন্যের কথা শুনিবার, অন্যকে সম্মান করিবার বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। যেনতেন প্রকারে ভোট হইয়া গেল আর গণতন্ত্র কায়েম হইয়া গেল—ইহা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নহে। সুতরাং নিজেদের মতবাদ অন্যদেশে তাহাদের কথিত শান্তির জন্য রপ্তানি করিবার চর্চা বন্ধ হউক। এইভাবে একটি দেশের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষার পরিবর্তন করিবার হীনচেষ্টাও বন্ধ করা হউক। যে যেই রকম আছে, তাহাদের নিজেদের মতো থাকিতে দেওয়া হউক। মোড়লদের মনে রাখিতে হইবে, অন্যকে ধ্বংসের আগুনে ঝলসাইলে সেই আগুনের আঁচ একটি পর্যায়ে নিজেদের গায়েও পড়িতে বাধ্য। মতবাদ তো পৃথিবীতে একটা নহে, আরো আছে। সুতরাং মতবাদে মতবাদে যদি আরো ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয় তখন এই পৃথিবী আর মানুষের বসবাসযোগ্য থাকিবে না। ইহার চাইতে মোড়লরা নিজেরাও শান্তিতে থাকুন এবং অন্যদেরও শান্তিতে থাকিতে দিন।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন