গত দেড় বত্সর কিংবা তাহারও অধিক সময় ধরিয়া করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত সমগ্র বিশ্ব। এই মহামারি সমগ্র বিশ্বের জীবনব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়াছে। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরিয়া দাঁড়াইতে শুরু করা মাত্রই নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য হইতে শুরু করিয়া শিল্প খাতের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উত্পাদনমুখী খাতের পরিবহন ব্যয় হইতে শুরু করিয়া প্রায় সকল ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করিয়াছে। করোনার কারণে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব অস্বীকার করিবার উপায় নাই, তবে ইহাও সত্য—উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণও এই ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বের পণ্যের উপর ট্যাক্স আরোপকে কেন্দ্র করিয়া থিওরি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ফারাক পরিলক্ষিত হয়, সামগ্রিক বাজেট-ব্যবস্থাপনা ও অপচয়সহ বিবিধ কারণে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়িয়া থাকে।
আমরা দেখিয়া আসিয়াছি, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে প্রতি অর্থবত্সরে যেই বাজেট প্রণয়ন করা হইয়া থাকে, তাহা কখনোই অর্ধেকের অধিক বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এই সকল দেশে বাজেট বাস্তবায়ন করিবার জন্য যেই ধরনের অবকাঠামো থাকিবার প্রয়োজন, তাহার অভাব পরিলক্ষিত হয়। অবকাঠামো-সুবিধা না থাকিবার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের অর্ধেকই অব্যবহৃত থাকে, ইহার ফলে বাজেটের অর্থের অপচয় বাড়িয়া যায়। আবার বাজেটের বরাদ্দ লইয়াও থাকে বিভিন্ন হিসাবনিকাশ। উদাহরণস্বরূপ ১০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা আসিলেও বিভিন্ন ভ্যাট ও ট্যাক্স কাটিবার পর দেখা যাইবে, হাতে রহিয়াছে মাত্র ৬০ টাকা। ইহার কারণে যাহারা বরাদ্দকৃত অর্থ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করিবেন, তাহারা প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া থাকেন বটে, কিন্তু শুরুতেই যে তাহারা বরাদ্দের শতভাগ অর্থ হাতে পাইতেছেন না, উহা অজানাই থাকিয়া যায়।
পাশাপাশি রহিয়াছে মুদ্রাস্ফীতি; ডলারের মূল্যের সঙ্গে সংশিষ্ট দেশের মুদ্রার বিনিময় হারের পার্থক্যের কারণে যেই পরিমাণ অর্থের বাজেট ঘোষণা করা হইয়া থাকে, বাস্তবতার নিরিখে উহাও হয়তো কম-বেশি হইয়া থাকে। এই সকল কারণে ঘোষিত বাজেটের বৃহৎ একটি অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না; যাহার প্রভাব পড়িয়া থাকে বাজারব্যবস্থা হইতে শুরু করিয়া সামগ্রিক অর্থনীতিতে। পণ্যের দাম বাড়িয়া যায়, যাহার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়া যায়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার উপর অসহনীয় প্রভাব পড়ে। অথচ উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা দায়িত্বশীল ভূমিকায় রহিয়াছেন তাহারা এই সকল বিষয় অগ্রাহ্য করিয়া কেবল তত্ত্বীয়ভাবে তাহাদের অর্জনকে তুলিয়া ধরেন। সংখ্যাগত বিচারে তাহাদের বাজেট কত বড় হইল, তাহার মাধ্যমেই সামগ্রিক উন্নয়নকে প্রতিফলিত করিতে চাহেন। অথচ অপচয়, মুদ্রাস্ফীতি, অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকিবার কারণে বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্রটি পর্দার আড়ালেই থাকিয়া যায়। আবার বিভিন্ন পরিসংখ্যান হইতে শুরু করিয়া অর্জন-ব্যর্থতার যেই হিসাবনিকাশ তুলিয়া ধরা হয়, তাহাতেও সত্যকে আড়াল করা হয়। সরকারি হিসাবনিকাশ, পণ্যের মজুত ঘাটতি ইত্যাদি সকল কিছুতেই থাকে অবাধ মিথ্যাচার। ইহা কি জনগণের সঙ্গে প্রবঞ্চনা নহে?
উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, সত্যকে আড়াল করিয়া কখনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নহে। করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। এইরূপ পরিস্থিতিতে কেবল ফাঁকা বুলি না আউড়াইয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের দায়িত্বশীলদের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সহিত প্রস্তুতি লইতে হইবে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি নিজেদের দুর্বলতাগুলিও চিহ্নিত করিতে হইবে। স্মরণ রাখিতে হইবে, জনগণের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করিয়া চিরকাল টিকিয়া থাকা যায় না।

