বছরের পর বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ দান —কথাটা বর্তমান সময়ে শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে তা করে চলেছেন অনেকেই। সম্প্রতি দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করেছেন মানবদরদী এমন এক ডাক্তার। গত একযুগ ধরে তিনি বিনামূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপন করে আসছেন, পাশাপাশি রোগিদের বিনামূল্যে দিচ্ছেন ফলোআপ। বলছি সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের কথা।
২০১১ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করে ২০১২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতাল। মাত্র দুই লাখ দশ হাজার টাকার বিনিময়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় সেখানে। জটিল এই অস্ত্রোপচার বাবদ কোনো পারিশ্রমিক নেন না ডা. কামরুল ইসলাম। কয়েকমাস পরপর কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগিদের ফলোআপও দিয়ে থাকেন বিনামূল্যে।
আলাপচারিতায় ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি হয়তো টাকা নিইনা, কিন্তু পক্ষান্তরে যেটুকু সম্মান আর ভালোবাসা পাচ্ছি তা তো কখনো কেনা যেতো না!'
অধ্যাপক কামরুল ও তার দল এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন, যার সফলতার হার ৯৬ শতাংশ। গত বছর করোনার প্রকোপে অন্যান্য রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা যেখানে প্রায় অকেজো ছিল, সেখানেও কামরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা মিলে প্রায় ২৫০টির মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। এদের মধ্যে ৩ জন ছাড়া বাকি সব রোগী সুস্থ জীবনযাপন করছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কামরুল ইসলামের বাবা আমিনুল ইসলাম পাকশী ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে রাজাকার ও বিহারীরা তাকে হত্যা করে। বাবার মৃত্যুর পর সন্তানের দায়দায়িত্ব মায়ের কাঁধে এসে পরে। স্বামীহারা এসএসসি পাশ মা সন্তানদের মানুষ করার জন্য ও নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং এইচএসসি পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন সমাজবিজ্ঞানে। সেখানে কৃতিত্বের সাথে সমাজবিজ্ঞানে ১ম স্থান অধিকার করে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করে ১৯৮১ সালে লালমাটিয়া মহিলা কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।
সেই আমিনুল-রহিমা দম্পতির চার ছেলের মেজো ছেলে কামরুল ছিলেন প্রখর মেধাবী। তিনি চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ পাকশী থেকে ১৯৮০ সালে এসএসসিতে মেধা তালিকায় ১৫তম স্থান অর্জন করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং যথারীতি এইচএসসি পরীক্ষায় ১০ম স্থান অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে তখনকার আটটি মেডিকেল কলেজের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে পরবর্তীতে এফসিপিএস (সার্জারি), এফআরসিএস (এডিন), এমএস (ইউরোলজি) ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৩ সালে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে হিসেবে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে যোগ দেন। প্রথমবারের মতো সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ করেন ২০০৭ সালে। মজার বিষয় হলো, কিডনি প্রতিস্থাপক সার্জনের দায়িত্ব নেয়ার আগে কামরুল ইসলাম কোরবানির গরু-খাসির কিডনি নিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। তিনি বলেন, 'প্রথম দিকে কিডনি প্রতিস্থাপক সার্জন হতে চাইনি, যেহেতু সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়েছে তাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে। শুরুতে চারটা মেশিন নিয়ে ডায়ালাইসিস সেটআপ শুরু করি, অল্পদিনে ৩০ জনের মতো নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতো, তাদের একজনকে প্রথম ট্রান্সপ্লান্ট করি, সেটা সফল হওয়ার পর রেফারেন্সে একটার পর একটা আসতে থাকে। এখন তা নিয়মিতই করে যাচ্ছি।’'
সরকারি চাকরিকালে জমানো টাকায় গাড়ি কেনার স্বপ্ন ছিলো, কিন্তু সে টাকায় গাড়ি না কিনে কিনেছেন ডায়ালাইসিস মেশিন। পাশাপাশি বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে সিকেডির কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তা দেশের কিডনি রোগীদের আস্থা এবং ভালোবাসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে কামরুল ইসলামের কিছুটা আক্ষেপ করলেন দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত আইন নিয়ে। তাঁর মতে, এ আইনে সার্জনদের প্রোটেকশন কম। ট্র্যান্সপ্লান্টের সময় রিলেশনশিপ যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সার্জনদের দায়ী করা হয়। অথচ সার্জনের দায়িত্ব অস্ত্রোপচার করা ও রোগীকে সুস্থ করে তোলা। তিনি আশাবাদী, দেশের বেসরকারিভাবে চিকিৎসা খাতে কিডনি প্রতিস্থাপন যে আশার আলো দেখাচ্ছে তা অদূর ভবিষ্যতে সরকারি মেডিকেলেও হবে এবং তা মেডিকেল খাতকে আরও এগিয়ে নেবে।
