পত্রপত্রিকার পাতা উলটাইলেই আমরা ধৈর্য, অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতার বিভিন্ন ধরনের খবর দেখিতে পাই। যত ধরনের অন্যায় অপরাধ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার নেপথ্যে অধৈর্যের একটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র খুঁজিয়া পাওয়া যাইবেই। প্রকৃত অর্থে, একজন সত্যিকারের মানুষের যেই সকল গুণ প্রয়োজন ‘ধৈর্য’ তাহার মধ্যে অন্যতম। ধৈর্য গুণটি মানুষকে সকল বিপদ আর দুরবস্থার মধ্যে শক্তি জোগায়। এই জন্য বলা হইয়া থাকে-তাড়াহুড়া শয়তানের কাজ।
মানুষ স্বভাবতই সুখে-শান্তিতে আনন্দ-উল্লাসে থাকিতে ভালোবাসে। কিন্তু এই পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন দিন কিংবা রাত নাই। এই জগতে কখনো এমন দিন আসিবে না, যখন আপদ বলিয়া কিছু থাকিবে না। মঙ্গলের পাশাপাশি অমঙ্গল থাকিবেই। অমঙ্গল কাহারোই কাম্য নহে বটে। তবে ভুলিয়া গেলে চলিবে না-মঙ্গল ও অমঙ্গলের উৎপত্তি কিন্তু একই শিকড় হইতে। এই কারণে কিশোরবেলা হইতেই আমাদের শিখানো হয়-অমঙ্গলকে জগৎ হইতে হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিয়ও না, তাহা হইলে মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে।
চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াস এই জন্য বলিয়াছেন-ধৈর্যের অভাবের কারণে অনেক বড় বড় সম্ভাবনা ধ্বংস হইয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে ধৈর্য এমন একটি গাছ, যাহার সারা গায়ে কাঁটা, কিন্তু ফল অতি সুস্বাদু। সুতরাং ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে?’ কাঁটার ভয়ে ধৈর্যহারা হইলে সাফল্য আসিবে কী করিয়া? মনে রাখিতে হইবে, মহান সৃষ্টিকর্তা সাফল্যের নিয়ামক রূপে বর্ণনা করিয়াছেন ধৈর্যকে। বিখ্যাত ফারসি কবি জালালউদ্দিন রুমির নিকট ধৈর্য হইল বুদ্ধিমত্তার উত্তম পরিচয়। তিনি মনে করিতেন-ধৈর্য মানে শুধু বসিয়া বসিয়া অপেক্ষা করা নহে, ধৈর্য মানে ভবিষ্যৎকে দেখিতে পাওয়া। ধৈর্য মানে কাঁটার দিকে তাকাইয়া গোলাপকে দেখা, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকাইয়া দিনের আলোকে দেখা। এই জন্য সর্বশক্তিমান স্রষ্টা যখন মানুষকে সীমাহীন কষ্ট, বালা-মুসিবত, বাধাবিপত্তির মধ্যে ফেলেন, তখন তিনি দেখিতে চাহেন-ঐ ব্যক্তি ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে সক্ষম কি না। যাহার মধ্যে ধৈর্য নাই, ধরিয়া লইতে হইবে তিনি একজন দুর্বল মনের মানুষ। যাহার ধৈর্য নাই, তাহার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং সাহসও নাই। অধৈর্য অস্থিরতা কত বড় ক্ষতি করিতে পারে, তাহার উদাহরণ দেওয়া যায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক গুলজারের দেশভাগ সংক্রান্ত একটি গল্প হইতে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় একটি গরিব পাঞ্জাবি পরিবার সদ্যোজাত যমজ বাচ্চা লইয়া ভিড়ে ঠাসা ট্রেনের ছাদে উঠিয়াছেন। ভিড়ের চাপে বাবা-মা খেয়ালই করেন নাই কখন তাহাদের একটি বাচ্চা মারা গিয়াছে। ট্রেন তখন নদী পার হইতেছে, একজন বলিয়া উঠিলেন, সর্দারজি, মরা বাচ্চাকে আর কোলে রাখিয়া লাভ নাই, গুনাহ হইবে, নদীতে ভাসাইয়া দাও। দেশভাগ, দেশত্যাগ, বাচ্চার মৃত্যু-সর্দারজির তখন মাথার ঠিক নাই, তিনি বউয়ের কোল হইতে জোর করিয়া বাচ্চাটিকে টানিয়া লইয়া ছুড়িয়া দিলেন নদীর জলে। রাতের অন্ধকারে একটি বাচ্চার কান্নার কণ্ঠ শোনা গেল। পরক্ষণেই সর্দারজী সন্দিহান হইয়া বউয়ের কোলে হাত দিয়া দেখিলেন-তাহার বউ মরা বাচ্চাটিকে কোলে লইয়া কাঠ হইয়া বসিয়া আছেন। জীবিত বাচ্চাটি তখন নদীর গভীরে। সুতরাং সমাজ-রাজনীতি হইতে শুরু করিয়া ব্যক্তিজীবন-কোথাও ধৈর্যহারা হইলে চলিবে না। হতাশ হওয়া যাইবে না।
ভুলিয়া গেলে চলিবে না-আমরা কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় আছি। মনে রাখিতে হইবে-একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আধাসামন্তবাদী সমাজ হইতে আমাদের উত্তরণ ঘটিয়াছে। কোনো অন্ধকরাই রাতারাতি দূর হয় না। ইহাও দূর হইতে সময় লইবে। চারিদিকে তাকাইলে আমরা কিন্তু এখনই অনেক পরিবর্তন দেখিতে পাইব।
এককালের অন্ধকারই যেমনই শেষ কথা ছিল না, তেমনটি এই আধা-অন্ধকার দিনগুলিও শেষ কথা নহে। আমাদের নিয়মশৃঙ্খলার মনে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। কোনো জাতি ইহার ব্যত্যয় ঘটাইয়া উন্নতি লাভ করিতে পারে নাই। তবে মোনাফেকি করা চলিবে না। একটা ‘আদর্শ’ তো আমাদের সম্মুখে থাকা চাই। আর সেই আদর্শই হইল ‘রুলস অব ল’। সুতরাং আমাদের নিয়মকানুন ও আইন মানিয়া চলিতে হইবে। এবং তাহা সকলের জন্যই প্রযোজ্য হইতে হইবে।
