কিছুদিন পূর্বে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে সমাপ্ত হইল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬। পৃথিবীকে বাসযোগ্য করিবার জন্য বিভিন্ন দেশ বর্তমানে পরিবেশ রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করিতেছে। পরিবেশবাদী ও সাধারণ অনেক নাগরিকও এখন এই ব্যাপারে সচেতন ও সোচ্চার; কিন্তু আমরা নিজেরা আজ এমন অনেক কর্মকাণ্ডের সহিত সম্পৃক্ত যাহার কারণে আমাদের গোচরে-অগোচরে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হইয়া যাইতেছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের কথার চাইতে কাজকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আজ এমন একটি বিষয় লইয়া পাঠক, সরকার ও সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাই যাহার কারণে আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ পড়িয়াছে মারাত্মক হুমকির মুখে। প্রকৃতি ও পরিবেশের বন্ধু বলিয়া খ্যাত ব্যাঙ আজ বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় স্থান পাইয়াছে। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, দেশে ইদানীং ডেঙ্গু, কলেরা, টাইফয়েড, অ্যানথ্রাক্স ও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়িয়া গিয়াছে। এই সকল ভয়ংকর রোগবাহী কীটপতঙ্গ খাইয়া এই সকল রোগের প্রাদুর্ভাব হইতে আমাদের রক্ষা করিত যেই ব্যাঙ, আমরা সেই বন্ধু প্রাণীটিরই জীবন আজ বিপন্ন করিয়া চলিয়াছি! খাল-বিল, নদীনালা, পুকুর-জলাশয়, বনজঙ্গল ধ্বংসের পাশাপাশি ইরি-বোরো ও রোপা-আমন মৌসুমে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করিবার কারণে মারা যাইতেছে ‘প্রাকৃতিক পোকা মারিবার যন্ত্র’ ব্যাঙ। ইহাতে কৃষিবান্ধব অন্যান্য প্রাণী যেমন পাখিরাও পড়িয়াছে বিপাকে। নওগাঁর রাণীনগরে যেই সকল এলাকায় চার-পাঁচ বৎসর পূর্বেও প্রচুর ব্যাঙ দেখা যাইত, সেখানে আজ এই উপকারী প্রাণীটির দেখা মিলা কঠিন। সমগ্র দেশেই যে একই পরিস্থিতি বিরাজমান, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
বর্তমানে ইরি-বোরো মৌসুমে জমি চাষ হইতে শুরু করিয়া ধান কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ করিতে হয় প্রায় তিন বার। কীটনাশকও স্প্রে করা হয় তিন-চার বার। রোপা-আমন মৌসুমেও একই রকমে একাধিকবার সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় জমিতে। এত বিষপ্রক্রিয়ার মধ্যে এই প্রাণীটি বাঁচিবে কীভাবে? অন্যান্য উপকারী ও ফসলবান্ধব প্রাণীও একই কারণে মারা যাইতেছে। বিষয়টি তাই চিন্তার বড় কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। গবেষকরা বলিতেছেন, এক জীবনে একটি ব্যাঙ ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকার ফসল রক্ষা করে। এই প্রাণীটির মলমূত্র ও দেহাবশেষও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। শস্যখেতের পামরি পোকা, হলুদ মাজরা পোকা, ক্ষতিকর বিভিন্ন প্রকার ফড়িং ইত্যাদি খাইয়া উপকার করে। বড় সোনা ব্যাঙ ও সবুজ ব্যাঙ ২০০ হইতে ৪০০ গ্রাম ওজনের হইয়া থাকে। এই সকল ব্যাঙ দেহের অর্ধেক পরিমাণ পোকা প্রতিদিন খাইতে পারে। এইভাবে স্থল ও জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও খাদ্য শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তাহার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) সমীক্ষা অনুযায়ী আমাদের দেশে সবুজ ব্যাঙ, কোলা ব্যাঙ, কুনো ব্যাঙ, গেছো ব্যাঙ ও সোনা ব্যাঙসহ ৪৯ প্রজাতির ব্যাঙ রহিয়াছে। তাহার মধ্যে অন্তত ১০ প্রজাতির ব্যাঙ আছে বিপন্নের তালিকায়। ২৭ প্রজাতি রহিয়াছে কিছুটা উদ্বেগজনক অবস্থায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কম বৃষ্টিপাতের কারণে অল্প পানি বা দূষিত পানিতে ব্যাঙাচিগুলি টিকিয়া থাকিতে পারে না।
বিশ্বব্যাপী ব্যাঙ রক্ষায় ২০০৮ সাল হইতে বিশ্ব ব্যাঙ দিবস পালিত হইলেও এখনো আমাদের মধ্যে এই ব্যাপারে তেমন সচেতনতা গড়িয়া উঠে নাই। তাই এই প্রাণীটি রক্ষায় সকলকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হইতে হইবে। খাওয়া বা পাচার করিবার জন্য ব্যাঙ শিকার করিবার প্রবণতা বন্ধ করিতে হইবে। জৈবসার ও প্রাকৃতিক কীটনাশকের ব্যবহার বাড়াইতে হইবে। এই উভচর প্রাণীটির নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করিতে প্রয়োজন আবাসস্থল রক্ষা করা। প্রয়োজনে কৃত্রিম প্রজনন করিয়া হইলেও ব্যাঙ টিকাইয়া রাখিবার সর্বাত্মক চেষ্টা করিতে হইবে। তাহা ছাড়া দেশের পরিবেশ আইন অনুসারে ৪০টি সংরক্ষিত এলাকা রহিয়াছে। এই সকল এলাকার বাহিরেও ব্যাঙ লইয়া জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম চালানো একান্ত দরকার।
