প্রতারক শামিম ভূঁইয়ার রয়েছে রাজধানীসহ সারাদেশে বিশাল নেটওয়ার্ক। ব্যবসার নামে ভুয়া কার্যাদেশ দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেন। চাকরি দেওয়া, বিদেশ পাঠানোসহ নানা কৌশলে প্রতারণা করে আসছে এই চক্র। এই চক্রের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য জড়িত। এই চক্রের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের মামলা করে হয়রানি করার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই সদস্যরা সহায়তা করে আসছে। এই সদস্যরা ওই চক্রের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা পেয়ে থাকে। আর যিনি প্রতারিত হয়েছেন তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানিও করে আসছেন। এটা তাদের প্রতারণার নতুন কৌশল।
শামীম ভূঁইয়া ও তার চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট দিতেন। এসব পরিচয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেন প্রতারক চক্রের মূল হোতা শামীম। ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পার্টনারে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেন। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সিমেন্ট, টাইলস ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনের জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ভুয়া টেন্ডার দেখিয়ে সম্প্রতি ১০ জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনশ্রী ও বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক শামীম ভুঁইয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিরা হলেন শামীমের স্ত্রী সালমা ভূঁইয়া, এস এম আনিসুর রহমান, সালাউদ্দিন ও নাসির উদ্দিন। পুলিশ তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।
শামীম ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে ২২টি প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলায় চার্জশিট হয়েছে। দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন। তার সহযোগীদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। এই প্রতারক চক্রের সঙ্গে সব ধরনের মানুষ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গ্রুপও তাদের সহযোগিতা করছে। এছাড়া প্রতারক শামীম সিন্ডিকেটে রয়েছে সুন্দরী নারী, ভুয়া র্যাব ও পুলিশ সদস্য। এর আগেও প্রতারণার মামলায় গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে শামীম। ২২ মামলার আসামি হয়েও উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ঠুকিয়ে দিয়েছেন। তার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য এস এম আনিসুর রহমান, ময়না, সালাউদ্দিন, হান্নান ভুঁইয়া, সালমা ভুঁইয়া, খলিল, আহমেদ হোসাইন ও খন্দকার এনামুল হক।
টাকা ফেরত চাইতে গেলে বাসায় ডেকে অচেতন করে নারী সহযোগীদের সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করেও জিম্মি করা হয়। ভুক্তভোগীদের একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম শিহাব উদ্দিন। তাকে বড় ব্যবসা দেবে বলে প্রায় ৮ কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে নিয়েছে শামিম। শিহাব জানতো না যে শামিম প্রতারক। জীবনের আয়-রোজগারের সব কিছু দিয়ে শিহাব এখন সর্বশান্ত। এ কে এম শিহাব উদ্দিন জানান, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের গাউন ও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে বলে জানান ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেডের পরিচালক শামীম ভুঁইয়া। শিহাব নিজেও ওই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার। কাজটি করতে এক কোটি ১০ লাখ টাকা দিতে বলেন। হোয়াটসঅ্যাপে তাঁকে কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে ছবি ও গাউনের নমুনা পাঠান শামীম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে পরিচালক সেলিম খান স্বাক্ষরিত দুটি কার্যাদেশও দেখানো হয়। একটি ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেডের এবং আরেকটি জেড টেকনোলজির নামে। লাভের আশায় ঋণ করে এক কোটি ১০ লাখ টাকা শামীমকে দেন তিনি।
একইভাবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের কার্যাদেশ পাওয়ার তথ্যও দেন শামীম। এ কাজ করতে আরও ২০ লাখ টাকা নেন শামীম। ২০২০ সালের ১ মার্চ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের ৫০ লাখ টাকার বিল পাওয়া গেছে জানিয়ে জেড টেকনোলজির অ্যাকাউন্টে জমা দেন। আরেকটি কাজের কার্যাদেশ দেখিয়ে ওই টাকা আবার নিয়ে নেন শামীম। এরপর ১২ কোটি টাকার বিল বকেয়া দাবি করলেও ইসমাইল ট্রেডার্স লিমিটেড বা অংশীদারকে আর কোনো টাকা দেননি শামীম। সন্দেহ হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে শিহাব জানতে পারেন, সমাবর্তন হয়েছে ঠিকই, তবে সেই কাজ ইসমাইল ট্রেডার্স কিংবা জেড টেকনোলজি নামের কোনো প্রতিষ্ঠান পায়নি।
এভাবে ভুয়া কার্যাদেশ, নথিপত্র ও চেকে জাল স্বাক্ষর দিয়ে সাত কোটি ৯০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন শামীম। একইভাবে জালিয়াতির শিকার হয়েছেন আরও অন্তত ৯ জন ব্যবসায়ী। তাঁদের দুজন শামীমের মামলায় জেলও খেটেছেন। ভুক্তভোগীরা ২২টি মামলা করার পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাব সদর দপ্তরে শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, তথ্য-প্রযুক্তিরও বিকাশ হয়েছে। প্রতারকরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন।
দৈনিক ইত্তেফাকে শনিবার ‘প্রতারণার জাল সর্বত্র’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতারণার শিকার হওয়ার অনেকে শামিমের বিরুদ্ধে নানা তথ্য ইত্তেফাক অফিসে দিচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জামিন অযোগ্য করা উচিত। তাহলে প্রতারকদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা নিয়েছেন শামিম ভূঁইয়া। আর যারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেই মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন শামিম। প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে অর্ধাহারে-অনাহারে জীবন-যাপন করছেন। এই প্রতারক চক্রের সাথে যারা জড়িত তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হবে।
