নারী কতটা আগাইল?

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২১, ১০:০৫

বিশ্বব্যাপী নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য যেমন ছিল, তেমনি সমাজের সচেতন মহল যুগে যুগে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হইয়াছে। সমাজকে সচেতন করিতে লেখক, কবি, দার্শনিকরা সোচ্চার হইয়াছেন। কাজ হয় নাই। শুধু বাংলাদেশে নহে, বিশ্বব্যাপীই; কিন্তু প্রাচীন কাল হইতেই সমাজ যাহারা শাসন করিয়াছেন, সমাজে যাহারা ছড়ি ঘুরাইয়াছেন তাহারা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি মানিয়া লইতে পারে নাই।

কেবল তাহাই নহে, নারীকে হইতে হইয়াছে শারীরিকভাবে নিগৃহীত, নির্যাতিত। হইতে হইয়াছে পদে পদে অপমানিত। থাকিতে হইয়াছে গৃহবন্দি। ফলে একদিকে যেমন নারীরা তাহাদের অধিকার হইতে বঞ্চিত হইয়াছে, অন্যদিকে যাহার যাহার নিজস্ব মাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করিয়াছেন; আলোকিত পুরুষেরাও বিভিন্ন সময়ে নারীর প্রতি বৈষম্য দেখিয়া তাহাদের ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ক্ষোভের সহিত লিখিয়াছেন, ‘সাম্যের গান গাই, আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সমাজের নারীর প্রতি বৈষম্য দেখিয়া, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিকতা দেখিয়া আশা ব্যক্ত করিয়া লিখিয়াছিলেন, ‘আমার মনে হয় পৃথিবীতে নূতন যুগ এসেছে। অতিদীর্ঘকাল মানবসভ্যতার ব্যবস্থাভার ছিল পুরুষের হাতে। এই সভ্যতার রাষ্ট্রতন্ত্র অর্থনীতি সমাজশাসনতন্ত্র গড়েছিল পুরুষ। মেয়েরা তার পেছনে প্রকাশহীন অন্তরালে থেকে কেবল করেছিল ঘরের কাজ। এই সভ্যতা হয়েছিল এক ঝোঁকা। এই সভ্যতায় মানবচিত্তের অনেকটা সম্পদের অভাব ঘটেছে; সেই সম্পদ মেয়েদের হৃদয় ভাণ্ডারে কৃপণের জিম্মায় আটকা পড়েছিল। আজ ভাণ্ডারের দ্বার খুলেছে।’

দুঃখের বিষয় রবীন্দ্রনাথের সেই আশার প্রতিফলন ঘটে নাই। একসময় দেশে দেশে নারীর কোনো ভোটাধিকার ছিল না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রগুলি নারীকে ভোটাধিকার দিয়াছে। নারীকে পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণে আইন প্রণয়ন করিয়াছে; কিন্তু এখনো কিছুতেই কিছু হইল না। ইহা বাংলাদেশের জন্য যেমন সত্যি, তেমনি বহির্বিশ্বের জন্যও। সেই কথাই উঠিয়া আসিয়াছে মহিলা পরিষদের অনলাইনে পরিচালিত ‘জেন্ডার, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন’ বিষয়ক ১১তম সার্টিফিকেট কোর্সের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়া। তবে এই বক্তব্যের পাশাপাশি বক্তারা ইহাও উল্লেখ করিয়াছেন যে, নারীর মধ্যে যে জাগরণ সৃষ্টি হইয়াছে তাহা ইতিবাচক। এই কথাও সত্য যে, শুধু সরকারের প্রচেষ্টা বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও নারীর প্রতি বৈষম্য দূরের চেষ্টা চলিতেছে তাহাই নহে, সমাজে বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন, ব্যক্তিপর্যায়ে প্রচেষ্টাও চলিতেছে।

আমরা মনে করি, প্রাচীনকাল হইতে শুরু হওয়া এই অশুভ ধারা মানুষের মধ্যে যত শিক্ষার বিস্তার ঘটিবে ততই দূর হইবে। তাই নারী জাগরণ নারী অধিকার আদায় ও আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সর্বস্তরে শিক্ষার বিস্তার ঘটাইতে হইবে। ইহার সহিত নারীকেও তাহার আত্মমর্যাদা ও প্রচেষ্টা সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রদর্শন করিতে হইবে, ধরিয়া রাখিতে হইবে তাহার আত্মবিশ্বাসকেও। সারা জাগানো নিউজিল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ্যাডার্ন বলিয়াছেন, ‘শৈশব হইতেই আমার কখনোই এমন কথা মনে হয় নাই যে, আমার জীবনে উন্নয়নের জন্য আমার লিঙ্গ-পরিচয় কোনো প্রতিবন্ধকতা।’ এই বিশ্বাস আমাদের সর্বস্তরের নারীর মধ্যে প্রোথিত করিতে হইবে। আর সেই জন্য পরিবারের উপর প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তায় লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রদানের।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন