আলোকপাত

ভাষা নিয়ে জাতি, জাতি নিয়ে দেশ

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০৭

ভাষা শুধু যে মনের ভাব প্রকাশের বাহন তা নয়, ভাষা আমাদের অস্তিত্ব, চিন্তা-চেতনা ও বোধের প্রতীক। পৃথিবীর প্রায় সকল জনগোষ্ঠীর রয়েছে তার নিজস্ব মাতৃভাষা। মূলত মাতৃভাষার ভ্রূণ থেকেই একটি জাতির সৃষ্টি ও বিকাশ এমনকি মাতৃভাষাকে ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি জাতীয়তাবোধের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙালির আত্মপরিচয় তার মাতৃভাষার মাধ্যমেই। হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারী বাংলাভাষা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাভাষার ভাগ্যাকাশেও নেমে আসে নানা ধরনের দুর্যোগ। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বেরভিত্তিতে জন্ম হয় দুটি পৃথক রাষ্ট্রের। পূর্ববাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। পূর্ববাংলার জনসাধারণের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ঘোষণা দেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এসময় জিন্নাহ’র ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ২৪ মার্চ কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আবার উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এ ঘোষণা দেন। তখন ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা এই ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে ছাত্র-শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিম উদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে গঠন করে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদের সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিতে ডাকা হয় হরতাল। এ সময় হরতালকে বানচাল করার জন্যে পাকিস্তানি শাসক ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ২১ শে ফেব্রুয়ারি সকালে শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে শ্লোগান দেয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। পুলিশ ও ছাত্রের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের এই শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে ও গুলি চালায়। এই গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিক আর নাম না জানা আরও কয়েকজন নিহত হয়। এই নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলার মানুষ মাতৃভাষা রক্ষার জন্যে আরও বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরের দিন ২২শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র ও জনতা রাজপথে নেমে এসে মিছিল করে। একুশের মর্মান্তিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে অনেক কবি-সাহিত্যিক ও গীতিকার অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। এ সময় একুশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কবিতা ও গানের মাধ্যমে কিছু কবি-সাহিত্যিক ও গীতিকার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, মাতৃভাষার  জন্যে আত্মত্যাগের প্রেরণা জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে সারা বিশ্বে পালিত হয়।

সুতরাং একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে লিখিত কবিতা, নাটক, গান, গল্প, উপন্যাস, অডিও-ভিজুয়াল, ডকুমেন্টারি প্রভৃতি সহ সবকিছু বর্তমান প্রজন্মকে জানানো ও আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সংরক্ষণ করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আর এক্ষেত্রে সরকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। 

n লেখক :লাইব্রেরিয়ান, সিরডাপ