অনেক মনোবিজ্ঞানীর ভাষ্য অনুযায়ী ‘সুখ’ জিনিসটা হইল ‘স্টেট অব মাইন্ড’। তবে আমরা যত আধুনিক হইতেছি, ততই যেন স্বস্তিময় জীবন চলিয়া যাইতেছে বহু যোজন দূরে। সুতরাং কোটি টাকার প্রশ্ন তোলা যায়—কতখানি সুখে রহিয়াছে বাংলাদেশের মানুষ? তাহার চাইতেও গুরুতর প্রশ্ন—এই বিশ্বের পরাশক্তিরা কতখানি চাপের মধ্যে রাখিয়াছে ছোট ছোট দেশগুলিকে? এবং যাহারা চাপে রাখিয়াছে, তাহারাও কি সুখে আছে? তাহারা অবশ্য মহাভারতের একটি অংশ হইতে লিখিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গান্ধারীর আবেদন’ কবিতায় দুর্যোধনের মতো বলিতে পারেন—‘সুখ চাহি নাই মহারাজ! / জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।’ মহাভারতে দুর্যোধন যখন আত্মীয়দের হটাইয়া অখণ্ড রাজ্য অর্জন করিয়াছিলেন তখন তাহার পিতা ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—‘এখন কি হইয়াছ সুখী?’ দুর্যোধন তখন দম্ভ ভরিয়া এই উত্তর দেন যে—সুখের দরকার নাই, জয় অর্জনই তাহার লক্ষ্য। সুতরাং বিশ্বের অনেক পরাশক্তিধরের নিকট দুর্যোধনের মতো জয়টাই মুখ্য, সুখ নহে। আর এইখানেই যত সংকট, যত নেতিবাচক অভিজ্ঞতা।
সুখে বা স্বস্তিতে থাকিবার গবেষণা কম হয় নাই। এমনই একটি গবেষণার কথা কয়েক বত্সর পূর্বে জানাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকরা বলিয়াছেন—সুখী হওয়াটা একটি চর্চার বিষয়। অর্থাৎ একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা মিটাইবার মতো সবকিছু থাকিলেও তিনি সুখী না-ও হইতে পারেন। আবার কাহারো খুব সামান্য কিছু থাকিলেও তিনি সুখী হইতে পারেন; কিন্তু বর্তমানের এই বিশ্বায়নের যুগে সুখ কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা মনের উপর নির্ভর করে না। এই ক্ষেত্রে একজন মানুষ কোন পরিবেশে বাস করিতেছেন, তাহা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার নেপথ্যে রহিয়াছে পরাশক্তিদেরও বিশেষ ভূমিকা। যেমন—গ্যালোপের জরিপে দেখা গিয়াছে পরাশক্তিদের দ্বারা নিষ্পেষিত দেশগুলিই প্রধানত খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্যে রহিয়াছে। যেমন—ইরাক, রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান, লেবানন, সিয়েরা লিওন, ইরান প্রভৃতি দেশ। ইতিপূর্বে বিশ্বের ১৪৫ দেশের পৌনে ২ লক্ষ মানুষের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে একটি জরিপ প্রকাশিত হইয়াছিল। যেই সকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া একজন মানুষ সাধারণত সুখী হইয়া থাকে, সেই সকল প্রশ্ন হইতে প্রাপ্ত উত্তরের মাধ্যমে জরিপের ফলাফল তৈরি করা হইয়াছিল। যেমন প্রশ্নগুলির মধ্যে ছিল—আপনি গতকাল কতখানি বিশ্রাম পাইয়াছেন? নিজের জগতে কতখানি সম্মান রহিয়াছে বলিয়া আপনি মনে করেন? কতটা হাসি-আনন্দে থাকেন আপনি? প্রতিদিন ভালো বা মজার কোনো না কোনো কাজ করিয়াছেন কি না? গতকাল নূতন কিছু শিখিয়াছেন কি না? গত দিনটি কতটুকু আনন্দে কাটিয়াছে—এই রকম ইতিবাচক প্রশ্নমালার সাহায্যে বুঝিবার চেষ্টা করা হইয়াছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। ইহার বিপরীতে নেতিবাচক প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হইয়াছে ঐ নির্দিষ্ট দেশটির মানুষ কতখানি নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় ডুবিয়া রহিয়াছে। যেমন—গতকাল কোনো শারীরিক কষ্ট অনুভব করিয়াছেন কি না, উদ্বিগ্ন হইয়াছেন কি না, বিষণ্ণতায় ভুগিয়াছেন কি না, চাপ অনুভব করিয়াছেন কি না, ক্রোধ জাগিয়াছে কি না ইত্যাদি।
তবে সুখী হইবার বিষয় লইয়া মনীষীরাও অনেক ধরনের কথা বলিয়াছেন। যেমন—ডেল কার্নেগি বলিয়াছেন—‘যদি সুখী হইতে চাও, তাহা হইলে এমন একটি লক্ষ্য ঠিক করো, যাহা তোমার বুদ্ধি আর শক্তিকে জাগ্রত করিতে পারে এবং তোমার মধ্যে আশা আর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে।’ মহান আল্লাহতালা পবিত্র কোরআনের সুরা নাজমের ৩৯ নম্বর আয়াতে বলিয়াছেন—‘মানুষ যাহা চেষ্টা করে, তাহাই সে পায়।’ সুতরাং নিজের কর্মই শেষ কথা। মানুষ ভালো কর্মে ব্যাপৃত থাকিলে ভালো এবং খারাপ কর্মের মাধ্যমে খারাপ জিনিস অর্জন করিয়া থাকে। অর্থাৎ কর্মের ফল হিসাবেই মানুষ সুখী কিংবা অসুখী হয়। স্পষ্টতই আমাদের ভালো কর্ম করিতেই হইবে, যদি আমরা সুখী হইতে চাই।
