মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

মানুষকে কেন ভয় দেখানো হইবে?

প্রকাশ : আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২১, ০২:৩৭

উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবিধানিকভাবে ‘গণতন্ত্র’ রহিয়াছে; কিন্তু গণতন্ত্র যে আসলে কী জিনিস—তাহার বিপরীতে এই সকল দেশে নির্বাচন কেন্দ্রিক হানাহানি, হিংস্রতা, রক্তের হোলি খেলা দেখিয়া চমকাইয়া যাইতে হয়। প্রথম কথা হইল—গণতন্ত্র হইল স্টেট অব মাইন্ড। সেইখানে কথা বলিবার যেমন অবারিত স্বাধীনতা থাকিবে, মুক্তচিন্তার ফল্গুধারা বহিবে ইহার পাশাপাশি সেইখানে বিপরীত বা ভিন্ন মতের অন্যকে সম্মান করিবার বিষয়টি থাকিতেই হইবে; কিন্তু গণতন্ত্রের এই মূলগত বৈশিষ্ট্য—তাহা আমরা উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশেই দেখিতে পাই না। ইহা যেন গণতন্ত্র নামক দুধের বদলে চাউলবাটা গোলানো পিটুলি গোলা গিলানো। উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণও সেই ‘পিটুলি গোলা’ পান করিয়া ‘দুধ খাইয়াছি’ ভাবিয়া তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। নির্বাচনে সহিংসতা কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী—তাহা আমরা কয়েক দশক ধরিয়া একটি বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশের সকল ধরনের নির্বাচনে দেখিয়া আসিতেছি। সেইখানে নির্বাচনে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, হামলা-প্রতিহামলা, ভাঙচুর-নৃশংসতা, হানাহানি, খুনাখুনির হেন কোনো খারাপ দৃষ্টান্ত নাই যাহা হয় না। ধারালো অস্ত্রের আস্ফালন আর বোমাবাজি তো আছেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতে পারে—‘ওরে বাবা! এ কেমন নির্বাচন!’ এই জাতীয় অবস্থার উদ্দেশ্যেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার স্বদেশ পর্যায়ের সংগীতে বলিয়াছেন—‘ভাবছ হবে তুমিই যা চাও, জগত্টাকে তুমিই নাচাও, দেখবে হঠাৎ নয়ন খুলে, হয় না যেটা সেটাও হবে!’ 

বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত হইতে দেখা যায়, যেই সকল দেশে সহিংসতা অধিক সেইখানে বামপন্থিদের দীর্ঘকালীন প্রভাবও অধিক। দেখা যায় যে, বাম আন্দোলনের সময় হইতেই মূলত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের এক্সলেটরে চাপ পড়িয়াছে। নির্বাচনের সময় এই সহিংসতা আরো বৃদ্ধি পায়; কিন্তু কেন নির্বাচনের সময় সহিংসা বৃদ্ধি পায়? ইহার উত্তর খুঁজিতে কয়েক বত্সর পূর্বে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত হইয়াছিল ‘হোয়াট মেকস সাম ইলেকশনস ভায়োলেন্স?’ নামের একটি প্রবন্ধ। সেখানে বলা হয়—যখন কেহ বা কোনো দল ক্ষমতা হারাইবার ব্যাপারে আশঙ্কা বোধ করে কিংবা ক্ষমতা অর্জনের ব্যাপারে মরিয়া হইয়া উঠে—তখন সহিংসতা মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারে। তাহা ছাড়া, শাসন প্রণালিতে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতায় সহিংসতা করিয়া পার পাইয়া যাইবার সুযোগ থাকিলেও হিংসাত্মক ঘটনা বৃদ্ধি পাইয়া থাকে। গণতন্ত্র তো কোনো ম্যাজিক নহে যে উহার ভিতর দিয়া কয়লার ময়লা দূর হইয়া যাইবে। গণতন্ত্রের নিশ্চয়ই সবিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে; কিন্তু চাউলবাটা দিয়া তৈরি পিটুলি গোলাকে যেমন ‘দুধ’ বলা যায় না, তেমনি উন্নয়নশীল বিশ্বে নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যাহা হইতেছে, তাহাকেও ‘গণতন্ত্র’ বলা যায় না। 

বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্বের কোথাও কোথাও কথিত গণতন্ত্র রপ্তানিও করা হয় শান্তি আনয়নের নাম করিয়া। প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে কথিত গণতন্ত্র কায়েম করিবার ঘটনাও দেখা যায়’ কিন্তু গণতন্ত্র মানে কি শুধু ভোট? যেনতেন প্রকারে ভোট হইয়া গেল আর গণতন্ত্র কায়েম হইয়া গেল—ইহা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নহে। এই সকল দেশে গণতন্ত্রের নামে হিংসা-হানাহানি দেখিয়া লজ্জা হয়, দুঃখ হয়। এইভাবে হানাহানি, সহিংসতা চলিতে থাকিলে, বিশ্বে যত রকম ‘তন্ত্র’ সকল তন্ত্রকে ছাড়াইয়া সবচাইতে খারাপ কিছু আসিবে। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ দিয়া। আর তাহার পর সতর্ক করিয়াছেন বাড়াবাড়ি না করিতে। ইহার সহিত নিয়মশৃঙ্খলা ব্যতীত পৃথিবীতে কেহ কি উন্নত রাষ্ট্র গঠন করিতে পারিয়াছে? দলীয়করণ কিংবা দুর্নীতির অপকৃষ্টিতে ডুবিয়া কখনো উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়া যায় না। 

প্রশ্ন হইল—গণতন্ত্রের নামে মানুষকে কেন এইভাবে ভয় দেখানো হইবে? মানুষকে কেন এইভাবে অশান্তির মধ্যে বসবাস করিতে হইবে? মানুষ গণতন্ত্র বোঝে না, শান্তি বোঝে। মানুষ শান্তিতে ঘুমাইতে চাহে। নিরাপত্তার সহিত নিশ্চিন্তে বসবাস করিতে চাহে। কান্ডারি হুঁশিয়ার কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছেন—‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ’। সাঁতার না জানিলে স্বখাদ সলিলে ডুবিতে হইবে বইকি। এই দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার লঙ্ঘিতে হইবে রাত্রি নিশীথে, সুতরাং যাত্রীরা হুঁশিয়ার! 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এই লেভেল ক্রসিংগুলি কাহার? 

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জরুরি

বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা

দায়িত্বপ্রাপ্তরা রহিয়াছেন কেন?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আধুনিককালে প্রতিযোগিতার ধরন বুঝিতে হইবে

প্রচারেই প্রসার বটে, তবে তাহা প্রলয় ঠেকাইবে কি?

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে

ঘণ্টাধ্বনি শুনিতে কি পাও?