সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

‘রেখো মা দাসেরে মনে’

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২১, ২১:৪৫

আজ পাঁচদিন হয় হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে এসেছি। কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পরপর চারবার হাসপাতালে যাওয়ায় সেবার আর ঘরে ফেরার আশা ছিল না। দুই দুই ডাক্তার রায় দিয়েছেন—আমার দুই কিডনিই অচল। বাঁচলে বড়জোর সাত মাস বাঁচতে পারি। যতদিন মারা না যাই আমাকে যেন নার্সিং হোমে রাখা হয়। আমার ছেলেমেয়েরা রাজি হয়নি। তারা আমাকে বাসায় নিয়ে এসেছে। যে কদিন বাঁচব তারা আমাকে বাসায় রাখতে চায়। তাই আছি। যে কদিন আছি বিছানায় শুয়ে কাটাতে হবে। এই যে লিখছি তাও বিছানায় শুয়ে কষ্ট করে লিখছি। স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে আসা সম্ভব হবে কি না, জানি না।

ডাক্তাররা যখন আমাকে আকস্মিকভাবে জানালেন, সাত মাসের বেশি বাঁচব না, তখন ভয় পেয়েছিলাম। কিছু বন্ধুবান্ধবকে খবরটা জানিয়েছিলাম। এখন বাসায় ফিরে ভয়মুক্ত হয়েছি। মৃত্যুভয় আর নেই। পৃথিবীর দিকে আবার নতুনভাবে চোখ তুলে তাকিয়েছি। বড় সুন্দর লাগছে পৃথিবী। বড় মায়াময় সৌন্দর্যময় পৃথিবী, এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব, ছেলেমেয়ের মুখ আর দেখব না। ঢাকায় পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলাম লিখব না—এ কথাটাই মনে দুঃখ দিচ্ছে। তবু পাঠক ভাই ও বোনদের কাছে এখনই বিদায় নিচ্ছি না। দেখি না ডাক্তারের কথা সত্য হয় কি না। নাও তো হতে পারে। নিজে যেচে প্রিয় পাঠকদের কাছে বিদায় চাইব কেন? আমি আকস্মিকভাবে চলে যেতে চাই, সবার মনে একফোঁটা অশ্রুকণা তৈরি করে। তারপর ঐ অশ্রুকণার মতোই সবার মন থেকে হারিয়ে যাব।

বাংলাদেশে এখন প্রকৃতি বড় সুন্দর। ঝড়-বন্যা আছে। তবু এমন দেশটি কেউ খুঁজে পাবে না। ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। সেই ঝড়ের রাতে বন্ধুরা মিলে কাঁচা আম কুড়িয়ে নুন আর লালমরিচ দিয়ে খাওয়া। চাঁদনি রাতে লুকোচুরি খেলা। স্বপ্নের সেই আমার স্বদেশ আর দেখব না হয়তো। তাই ১৫ হাজার মাইল দূরে বসে স্বদেশকে প্রণতি জানাই: রেখো মা দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে। ৫০ বছরের বেশি রাজনৈতিক কলাম লিখছি। অনেকের মনে আঘাত দিয়েছি। তাদের কাছেও ক্ষমা চাই। 

৫০ বছরের বেশি দিন ধরে রাজনৈতিক কলাম লিখছি। তাই রাজনীতি আমাকে সহজে ছাড়বে কেন? রোগশয্যায় শুয়েও আমাকে রাজনৈতিক নানা প্রশ্ন শুনতে হয়েছে। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ব্যক্তিগত; কিন্তু অনেকের প্রশ্ন। হাসপাতালে রোগশয্যায় শুয়েও এই প্রশ্নের হাত থেকে রেহাই পাইনি। প্রশ্নটি ছিল—আমি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের এত কাছের লোক। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এত সম্মান করেন। তাঁরা আমার অসুস্থতার কথা জানেন। তারপরও একটা টেলিফোন করেও রোগের খবর নিলেন না কেন? আমি সবাইকেই জবাব দিয়েছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের লন্ডন সফর অত্যন্ত ব্যস্ততাময় ছিল। এবারের আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য সফর অত্যন্ত সফলও। আমি তাঁর আরো সাফল্য কামনা করি।

শেখ হাসিনা আমার খবর নেননি; কিন্তু রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রায় একই সময়ে লন্ডনে এসেছিলেন। তিনি এসেই আমাকে হাসপাতালে টেলিফোন করেছেন। স্বহস্তে চিঠি লিখে আমাকে পাঠিয়েছেন। আমার বন্ধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন আমাকে দেখতে হাসপাতালে আসতে চেয়েছিলেন। আমি বারণ করেছি। সুতরাং আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই। আমার প্রার্থনা—শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন। চতুর্থ দফাতেও দেশ শাসনের ম্যান্ডেট যেন পান। আমি দীর্ঘ ৫০ বছর বিপদে-আপদে আওয়ামী লীগের পাশে রয়েছি। এখন হয়তো আওয়ামী লীগের আমার সমর্থনের আর কোনো প্রয়োজন নেই। এখন আওয়ামী লীগের হাজার হাজার সমর্থক। এই হাজার হাজার স্তাবক ও সমর্থকের ভিড়ে আমি হারিয়ে গেছি। সেজন্য আমার মনে কোনো দুঃখ নেই। যদি ডাক্তারদের ভবিষ্যদ্বাণী অসত্য প্রমাণ করে বেঁচে থাকি, তাহলেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানাব। তার ভুলত্রুটির সমালোচনা করব। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে যেন বিচ্যুত না হই—এই প্রার্থনা আমার। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-বিচ্যুত যে হাইব্রিড আওয়ামী লীগ গড়ে উঠছে, তাকে প্রতিরোধের যুদ্ধে যেন জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যুক্ত থাকতে পারি। বিশ্ব ক্যাপিটালিজমের ঔরসে বাংলাদেশেও যে দানবতন্ত্র তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে যেন লড়াই চালিয়ে যেতে পারি। নজরুলের ভাষায় বলি—

‘যারা কেড়ে খায় ‘অষ্টাদশ’ কোটি মুখের গ্রাস
আমার রক্ত লেখায় যেন হয় তাহাদের সর্বনাশ’

দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র (শোষিতের গণতন্ত্র) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পারলেন না। উদীয়মান ক্যাপিটালিস্ট দানবের হাতে তাঁকে প্রাণ দিতে হলো। গণতন্ত্রের নামে বুদ্ধিজীবীদের মাতম এখনো শোনা যায়; কিন্তু দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। জিয়াউর রহমান দেশে দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তা পরে পরিণত হয় পরিবারতন্ত্রে। এখন তা রাজতন্ত্রে পরিণত হতে চলেছে। শুধু খোলসটা গণতন্ত্রের।

এই অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়েছে, সুশাসন দিতে পারেনি। তারই প্রমাণ, ঘরের কচি শিশুরা আবার রাস্তায় নেমেছে সড়ক পরিবহনের দৈত্যের নির্বিচার পথিক হত্যার প্রতিরোধে। আরেকবারও তারা নেমেছিল এবং ঐতিহাসিক সাফল্য দেখিয়েছে। পরিবহন সমস্যা (নৌপরিবহনসহ) এখনো বাংলাদেশের বড় সমস্যা। শাহজাহান খান মাঝেমধ্যে সমস্যা সামাল দেন। তার পরই তা আবার মাথাচাড়া দেয়। সরকারি গাড়ি লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভারেরা অবৈধভাবে চালায়। এবারও ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতেও চলেছে দুর্নীতি। ইউরোপ থেকে উইন্টার করোনা বাংলাদেশকেও ধাক্কা দিতে পারে। সরকার যদি দেশটাতে দুর্নীতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারত তাহলে দেশটাকে কিছুটা হলেও সুশাসন দান করতে পারত। সেটা হয়নি। কারণ দুর্নীতি দলের মধ্যে ঢুকে গেছে। দল ভাবছে রাজতন্ত্রের ছায়ায় আবারও তারা ক্ষমতায় ফিরতে পারবে। যদি ফেরেও দেশ শাসনের বদলে আত্মদ্বন্দ্বে তারা শেষ হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা এখন তা বুঝতে পারছে না। 

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য সমস্যাকে ইস্যু করে বিএনপি দেশে সরকার পতনের আন্দোলন তৈরি করার চেষ্টা করছে। সরকার শক্ত থাকলে এ আন্দোলনও সফল হবে না। বিদেশ থেকে ভালো ডাক্তার আনিয়ে খালেদা জিয়ার চিকিত্সা করানো উচিত। এটা বিএনপি করতে পারে। আবার সরকারও করতে পারে। এটা না করে বিএনপির রাস্তায় চেঁচামেচি প্রমাণ করে—দলনেত্রীর স্বাস্থ্যের জন্য তারা উদ্বিগ্ন নয়, তারা এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চায়। 

এর পেছনেও লন্ডনে বসে তারেক রহমান উসকানি দিয়ে চলেছে। জনগণকে সরকারের কাছ থেকে সুশাসন আদায়ের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত না করে এটা রাতারাতি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যর্থ রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করা। এটাই বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা—এই ব্যর্থতার আবর্তেই এখন সে ঘুরছে।

আশা করছিলাম দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্য থেকে নতুন মুজিববাদী দল গড়ে উঠবে। ১৯৫৪ সালে যেমন একজন শেখ মুজিব মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, তেমনি এখনকার এই অন্ধকার যুগেও একজন নতুন শেখ মুজিবের দেখা পাব। তাঁর সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে বলীয়ান এক তরুণ প্রজন্মের আবির্ভাব দেখে যেতে পারব। যদি না পারি—এই আশঙ্কা নিয়েই রোগশয্যায় শুয়ে দিন কাটাচ্ছি। যাতে দৈহিক শান্তির মধ্যে শেষনিশ্বাস ফেলতে পারি, সেজন্য আমার পাঠকদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

গবেষণা খাত হোক উন্নয়নের মূলমন্ত্র 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে করোনা মোকাবিলা 

ইত্তেফাক: তারুণ্যের অগ্রযাত্রার মূর্ত প্রতীক

অর্থনৈতিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দক্ষিণাঞ্চল 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নদীর আর্তনাদ শুনবে কে? 

প্রজন্মের অহংকার ইত্তেফাক 

মাদকাসক্তও কারো না কারো স্বজন

পর্যটন এলাকা সমৃদ্ধ, তবে নিরাপদ নয়