সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

ইন্দিরা গান্ধীর শেষ এবং অসমাপ্ত সাক্ষাৎকার

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৪:১৭

বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও বিভিন্ন জেলার লোক আমাকে ফোন করে জানতে চান—ইন্দিরা গান্ধী কে ছিলেন? তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কী করেছেন? আমি দু-এক জনকে জবাব দিয়ে বলেছি, আপনারা আপনাদের দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসটা একবার পড়ুন অথবা আপনাদের পূর্বসূরিদের জিগ্যেস করুন, ইন্দিরা গান্ধী কে ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকাটাই-বা কী ছিল।

আমি তাদের বলেছি, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিদি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যখন বাংলাদেশের ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল, তখন ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের ১ কোটি মানুষকে ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং ভারতের সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে। সেজন্য সে সময়কার মানুষজন, যারা এখনো জীবিত আছেন, তারা জানেন—ইন্দিরা গান্ধী কে।

ইন্দিরা গান্ধী ভারতের একজন সফল প্রধানমন্ত্রী তো বটেই, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ইতিবাচক ভূমিকা তার সেই গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে তিনি নিজের বাড়িতে নিজেরই দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগেই তিনি একটি ফরাসি সংবাদপত্রের সাংবাদিককে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি বিস্তারিত ভাবে জানিয়েছিলেন ভারত সম্পর্কে তিনি কী ভাবেন। সাক্ষাত্কারটি দুটি পর্বে দেওয়ার কথা ছিল। প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বের সাক্ষাত্কারটি দিতে তিনি যেদিন নিজের ২ নম্বর সফদরজং রোডের বাড়ি থেকে লাগোয়া ১ নম্বর আকবর রোডে তার পুত্র রাজীব গান্ধীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন তখনই তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ফলে দ্বিতীয় পর্বের সাক্ষাত্কারে তিনি কী বলতেন তা আর কখনই জানা যায়নি।

আজ থেকে ৩৭ বছর আগে মৃত্যুর কিছুদিন আগেই ইন্দিরা গান্ধী যে মূল্যবান সাক্ষাত্কারটি দিয়েছিলেন যদিও সেটি অসমাপ্ত ছিল, তবু সেই সাক্ষাত্কার থেকে তার সেই মুহূর্তের মনোভাব আশা-নিরাশার একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়, যার মূল্যও বড় কম নয়। তার এই সাক্ষাত্কারটি আমাদের হাতে এসেছে কিছুদিন আগে। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুদিন ৩১ অক্টোবর, জন্মদিন ১৯ নভেম্বর, আর বাংলাদেশের বিজয় মাস ডিসেম্বর। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই তার এই শেষ সাক্ষাত্কারটির কিয়দংশ আমরা ইত্তেফাকের পাঠকের হাতে তুলে দিলাম।

স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন আগে যেমন, তেমনি আজও আমায় উদ্দীপিত করে। আমাদের স্বপ্নের যে স্বাধীন ভারত, সেই দেশের সব মানুষের জন্য সুন্দর জীবনের বন্দোবস্ত থাকবে। এ তো কেবল অর্থনীতির প্রশ্ন নয়, বা মানুষের জীবনযাত্রার মানের প্রশ্নও নয়। এটা আরও অন্য কিছুর স্বপ্ন দেখায়। 
ভারতের মানুষের ভেতর সেই ক্ষমতা আছে, যা কিনা অফুরন্ত শক্তির উৎস। এই জোরটাই তাদের সব বাধাকে অগ্রাহ্য করার এবং কোনো বাধার সামনেই নতি স্বীকার না করার শক্তি জোগায়। ভারতের মানুষের ওপর আমার সেই আস্থা আছে।

আমরা জানতাম, স্বাধীনতার হাত ধরেই আমাদের সামনে উঠে দাঁড়াবে নানা বাধার পাহাড়। আমরা তাই বারবার বলেছি যে, কোনো জাদুবলেই ভারতের মানুষের দারিদ্র্য দূরে করা যাবে না। দেশকে শক্তিশালী করার কোনো সহজ পন্থা নেই। এই লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য আমাদের অনবরত লড়াই করে যেতে হবে। আমি জানি, এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে এখনো অনেক পথ পেরোতে হবে। অতীতে অনেক ভুল হয়েছে, অনেক বাধাও এসেছে, কিন্তু আপামর 

মানুষের এই যে আশা, একে পূরণ করতেই হবে। সব মানুষ ভারতের অগ্রগতি দেখতে পান না। এর একটা কারণ হলো, সর্বদা বিরুদ্ধ সমালোচনার স্রোত। অন্য দেশেও অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু একদল মানুষ আর খবরের কাগজ সব সময় কেবল আমাদের ব্যর্থতাগুলোই বড় করে দেখায়। খারাপটা তাদের চোখে পড়ে আগে। জাতীয় অগ্রগতির চিত্রটা আসে পরে। অন্য দেশ থেকে কেউ যদি আসেন, তাহলে আমরা তাদের কী করতে পেরেছি তার হদিস দেওয়ার আগে কী কী পারিনি তার ফিরিস্তিটাই বড় করে দিই। যখন কোনো বিদেশিকে আমি জিজ্ঞাসা করি যে, তোমরা ভারত সম্পর্কে এত ভুল ধারণা নিয়ে চলো কেন, তখন তারা বলে, এসব তারা জেনেছে ভারতীয়দের কাছ থেকেই। তখনই আমার আর কিছু বলার থাকে না।

আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ একধরনের হতাশায় ভোগেন, যে হতাশার বীজ তারা দেশের মানুষের মনেও রোপণ করে দেন। তাদের সামনে কোনো আদর্শ নেই। এই অবস্থা অন্য দেশেও যে নেই, তা নয়। কিন্তু আমাদের প্রাপ্তিটাকেও ছোট করে দেখানোর এই চেষ্টা কেন? আমার ধারণা, এর পেছনে আছে আমাদের সবকিছুতেই লাভক্ষতির অঙ্কটা খতিয়ে দেখার প্রবণতা। কেবল এখানেই নয়, এ প্রবণতা বাড়ছে সারা বিশ্বেই। 
মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন এবং একই সঙ্গে তা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষেও বটে। যদি এটা কেবল যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তাদের এবং সর্বোপরি সরকারের দায়িত্ব হয়, তাহলে এটাও ঠিক যে সাধারণ মানুষের দায়িত্বও খুব কম নয়। কিন্তু তারা এটা বুঝতে চায় না যে, তারা নিজেরা সক্রিয় না হলে কিছুই হবে না। 


অনেকে এসে বলেন, সাধারণ মানুষ এ দেশে ন্যায়বিচার পায় না। তারা বলেন যে, তারা যা করেছেন ঠিকই করেছেন কিন্তু তবু তারা হেরে গেলেন কারণ বিপক্ষ দল দামি উকিল দিয়েছিল। ফলে বিচারব্যবস্থার একটা বদল চাই। তারা বিচারের পেছনে রাজনীতির হাত খুঁজতে বসেন। কিন্তু আমরা বিচারব্যবস্থাকে রাজনীতির আওতায় বাইরে রাখতে চাই। আমরা এমনকি বিচারকদের সঙ্গে মুখোমুখি হতেও চাই না। কিন্তু তাও কানাকানিটা শুরু হয় এবং দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া একটা শ্রেণির প্রশ্নও তো থাকে। এই মুহূর্তে বিচারব্যবস্থায় বদল হোক, এটা বিচারকরাও চাইবেন, তা হয়তো নয়। তবু বদল তো চাই বটেই। নইলে দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর হবে না। দেশ এগোতে পারবে না।

দেশ চালাতে গেলে যে অনেক সমস্যা আছে, তা মানুষ বুঝতে চান না। তাদের ধারণা, সব ঠিকই চলছে। এখন যে ক্ষমতায় যাবে সে-ই দেশ চালিয়ে নিতে পারবে। তাছাড়া আমরা যখন যাত্রা শুরু করেছি, তখন থেকেই আমাদের ওপর বিদেশি চাপ থেকেছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপও আছে। আফ্রিকার কতকগুলো দেশ তো আজ বুঝতে পারছে, অবস্থা কতটা খারাপ। তারা গরিব এবং টের পাচ্ছে, চাপটা কতটা মারাত্মক। যেহেতু তারা ছোট, ফলে ক্ষমতাবানরা চাইছে তাদের গিলে খেতে। আমাদের অবস্থা এতটা খারাপ নয়। কিছু পশ্চিমি দেশ আজকাল বলতে শুরু করেছে, অন্য দেশগুলো যদি তাদের পরামর্শ মানতে পারে, তাহলে আমরা কেন মানছি না। বলতে চাই, সব ক্ষেত্রেই আমরা কোন পলিসিতে চলব, তা আমরাই ঠিক করব। কোনো ব্লক

আমাদের পলিসি ঠিক করে দিক, এটা চাই না। এই জন্যই আমরা নন-অ্যালাইনমেন্টের পথ নিয়েছি। এর জন্য চাপ আসবে এবং বিপদও বাড়বে, কারণ যারা চায় আমরা তাদের তাঁবে চলে যাই, আমাদের ওপর চাপ দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, দেখা গেছে আমরা হয়তো কোনো প্রশ্নে কোনো একটা স্ট্যান্ড নিলাম, তারপর আমাদের ওপর চাপ দেওয়া হতে লাগল। এই তো, ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল অর্গানাইজেশনগুলোর ব্যাপারটাই দেখুন না। কিছু ধনী দেশ বলছে তারা নাকি এ ব্যাপারে আমাদের পাশে আছে। কিন্তু যেই তাদের ওপর চাপ আসছে, অমনি তারাও স্ট্যান্ড বদলে ফেলছে।

চ্যালেঞ্জটা হলো, কোনো কোনো দেশ চাইছে, বিশ্বের ওপর তাদের আধিপত্যই যেন বজায় থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, সব দেশ কেন তাদের দাপট মানবে? কেবল এই জন্য যে, তারা পিছিয়ে থাকা? কিছু দেশ আমাদের কাছে আসে, এসে আমাদের বলে, তাদের হয়ে কথা বলতে। আমরা সেটা করতে গেলেই ধনী দেশগুলোর চাপ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে। এক্ষেত্রে দুটো বড় বিপদ আছে: প্রথমটা হলো ফের একটা বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। কারণ, কোনো দিকে না তাকিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করা হচ্ছে, যা ব্যবহৃত হলে আমাদের চেনা এই পৃথিবী নিমেষে ধ্বংস হয়ে যাবে। বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীরা তো জানেন, কোথায় কী হচ্ছে। এমনকি, ছোট চাষিরাও এই টেনশনের আওতার বাইরে নন, কারণ বড়লোকরা প্রভাবিত হলে গরিবদের ওপর তার ছায়া আসতে বাধ্য। তাছাড়া গরিব আর ধনী দেশগুলোর মধ্যে যে ফারাক তা-ও টেনশন বাড়াচ্ছে। সংঘাত বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ একটা চাইছে।

ধর্মীয় সমস্যার কথা যখন বলি, আইন করে কখনো ধর্মকে মোছা যায় না। বহু দেশ চেষ্টা করেছে, পারেনি। আর ভারতের মানুষ তো আর সব দেশের থেকে বেশি ধর্মপ্রাণ। আপনি তাদের ধর্ম থেকে সরাতে পারবেন না। আমাদের চেষ্টা হওয়া উচিত ধর্মের মূল শিক্ষা থেকে যেন আমরা সরে না যাই, সেদিকে নজর রাখা। কিন্তু ধর্মের তো আরও দিক আছে, যাকে দূরে রাখতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, আপনি সেটা সবাইকে মানতে বাধ্য করতে পারবেন না। ধর্মই আমাদের দেশে প্রধান ঐক্য নির্মাণকারী শক্তি। ধর্মই এখানে মানুষের কাছে সব রকম সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়।

ভারত হলো সেই দেশ, যার সহ্য করার শক্তি বিপুল। আমি ধর্ম থেকে সরে আসতে বলছি না। কিন্তু সময় যত এগোবে আমাদের তো তার সঙ্গেও তাল রেখে এগোতে হবে। এখন একজন চাষি যদি কুসংস্কারে ভোগেন, তাহলে তো মুশকিল। তাকে তো ভেবে দেখতে হবে, এই সংস্কার থেকে তার কোনো লাভ, কোনো উপকার হচ্ছে কি না। তিনি যদি বোঝেন যে হচ্ছে না, তাহলে তিনি তাতে আর বিশ্বাস করবেন না। আমি হয়তো এমনিতে কোনো মন্দিরে যেতাম না, কিন্তু আমায় তো মানুষ মন্দিরেও আমন্ত্রণ করেন। আমি তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করি; কারণ, না হলে তারা আহত হবেন। আমি তাই ধর্মনির্বিশেষে সব মন্দিরেই যাই। আসলে ব্যাপারটা হলো সেই ঐতিহ্য, যা এতকাল মানুষকে শক্তি জুগিয়েছে।’

লেখক: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা