সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৬

ঢাকার রাজপথ আবার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল। বিদ্যমান পরিস্থিতি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে স্মরণ করাইয়া দিতেছে। সেই বৎসর ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে নিহত হইলে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাঙ্গন ছাড়িয়া নামিয়া আসে রাজপথে। সেই দুই কলেজ শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ পরবর্তীকালে ছড়াইয়া পড়ে সারা দেশে।

৯ দফা দাবিতে তাহারা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হইয়া উঠে। এইবারও তাহাদের দাবি ৯ দফা। এইবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ২৭ শতাংশ পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হইলে প্রথমে শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। একপর্যায়ে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে লাভ করে নূতন মাত্রা এবং এখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনই মুখ্য হইয়া উঠিয়াছে। রামপুরায় স্কুলছাত্র মইনুদ্দিন ইসলাম দুর্জয় বাসের চাকায় পিষ্ট হইবার পর এই আন্দোলন ক্রমেই বেগবান হইতেছে বলিয়া প্রতীয়মান।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত মায়ের বুক খালি হইবে? আমাদের সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা কেন এত বিশৃঙ্খল ও দুর্ঘটনাপ্রবণ? দুর্জয়কে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাহার মা রাস্তায় বসিয়া পড়েন ছেলে ফিরিয়া আসিবে বলিয়া। কিন্তু তাহার ছেলে জীবিত নহে, লাশ হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা লইয়া কাজ করা সংস্থাগুলি বলিতেছে, প্রতি বত্সর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায় তাহার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী ও শিশু। ২০২০ সালে যে ৬ হাজার ৬৮৬ জন লোক মারা গিয়াছে তাহার মধ্যে ৭০৬ জন শিক্ষার্থী ও ৫৪১ জন শিশু।

এই শিক্ষার্থী ও শিশুদের ব্যাপারে আমরা কেন এত উদাসীন? আমরা কীভাবে তাহাদের বাস হইতে ধাক্কা দিয়া ফেলিয়া দিতে পারি? আমরা কীভাবে এতটা পাষণ্ড ও নির্মম হইতে পারি? ২০১৮ সালের আন্দোলনের পর আমরা তাহাদের দাবিদাওয়া মানিয়া নিয়াছিলাম। কিন্তু আমরা তাহাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে পারিলাম না কেন? সড়কের নিরাপত্তায় যে সড়ক পরিবহন আইন করা হইল, ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হইল, তাহার বাস্তবায়নে কেন এত গড়িমসি ও লুকোচুরি? আমরা যদি আমাদের সন্তানদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে না পারি, তাহা হইলে তাহারা বড়দের নিকট হইতে কী শিক্ষা লাভ করিবে? ইহার পর প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়াছিলেন, তাহার বাস্তবায়ন দেখা যায় নাই, ইহাতেও রহিয়াছে জন-অসন্তোষ।

শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া পাকিস্তান আমলেও কার্যকর ছিল। তাহা হইলে স্বাধীন দেশে তাহা কেন কার্যকর হইবে না? আশার খবর হইল, সরকার বিআরটিসি বাসের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করিয়াছেন। গতকাল ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতি সংবাদ সম্মেলন করিয়া গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি মানিয়া নিয়াছেন। ছুটির দিন ব্যতীত সকাল ৭টা হইতে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত ইহা অদ্য বুধবার হইতেই কার্যকর হইতেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত শুধু ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ থাকিবে। স্বাভাবিক কারণে এই সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট হইতে পারে নাই।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তাহারা সারা দেশেই হাফ ভাড়া কার্যকরের কথা বলিয়াছেন এবং তাহাদের ৯ দফা দাবির সপক্ষে নূতন কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছেন। তাহাদের দাবিসমূহের মধ্যে অন্যতম হইল—নিহত সকল শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত সকল যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, সড়ক, নৌ ও রেলপথে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ পাশ নিশ্চিত করিতে প্রজ্ঞাপন জারি করা, বিআরটিএর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সারা দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার স্বয়ংক্রিয় আধুনিকায়ন এবং পরিকল্পিত বাস স্টপেজ ও পার্কিং নির্মাণ প্রভৃতি। শিক্ষার্থীদের এই সকল দাবি অযৌক্তিক নহে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামাইতে হইবে। পঁচাত্তরের কালরাত্রে পরিবার-পরিজন হারানো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাইতে স্বজন হারানোর বেদনা আর কে ভালোভাবে বুঝিতে পারেন? সুতরাং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে। ইহার ব্যত্যয়েই উন্নয়নশীল বিশ্বে হানাহানি দেখা দেয়। অতএব, শিক্ষার্থীদের পুনর্জীবিত দাবিগুলি মানিয়া নিতে হইবে। এমনটি তো নহে যে, তাহারা শুধু হাফ ভাড়ার জন্য আন্দোলন করিতেছেন এবং এই জন্য তাহাদের হেয় করিবারও কোনো অবকাশ নাই।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ দায়িত্ব পালন

প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক হওয়া উচিত

অস্পষ্টতা গুজব সৃষ্টির সহায়ক

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত

প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না