সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৫২

১ জুলাই ২০২১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীবিহীন ক্যাম্পাসে শতবর্ষপূর্তি উৎসব অনেকটা প্রতীকী আকারে পালিত হয়েছিল। আমাদের জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক এ ক্ষণকে স্মরণীয় করতে ১ ডিসেম্বর সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বর্ণিল উৎসবের মাধ্যমে শতবর্ষপূর্তি উদযাপন করা হচ্ছে। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ এবং মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আয়োজনের ঔজ্জ্বল্য আরও বাড়িয়েছে।

আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য হয়েছে—‘শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। এ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে শতবর্ষের বর্ণিল আলোয় সেজেছে ক্যাম্পাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম লোগো ছিল ‘ট্রুথ শ্যাল প্রিভেইল’। শিক্ষার আলোয় দেখানো পথে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম আর ত্যাগের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। আর এই চেতনার বীজ বপিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্বর ক্যাম্পাসে। সকল অপশক্তি-অপশাসন-সাম্প্রদায়িকতা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরন্তরভাবে আলো ছড়িয়ে চলেছে বাঙালির জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান লোগো, ‘শিক্ষাই আলো’—একেবারে সরল অভিব্যক্তি, কিন্তু গভীর অর্থবোধক। শিক্ষা মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। ভাবনার জগেক করে উন্মীলিত। জ্ঞান আর প্রজ্ঞার আলোয় দূর করে গোঁড়ামি আর যুক্তিহীন কূপমণ্ডূকতার অন্ধকার। পূর্ব বাংলার অধিবাসীগণ ঐতিহাসিকভাবেই সহজ-সরল আর ছিল সব ধরনের বঞ্চনাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়ার সহজাত প্রবণতার অধিকারী।

১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালে অধিবাসীদের ভাবনায় অধিকারের ধারণা অনুপস্থিত ছিল। কেমন ছিল সে সময়? ব্রিটিশদের এদেশীয় প্রতিভূ জমিদারদের প্রজা ছিল জনগণ। প্রজা শব্দের মধ্যে জমিদারদের প্রতি প্রভুত্বের ব্যঞ্জনা নিহিত ছিল। জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে চলার সময় আনুগত্য আর ভক্তির নিদর্শনস্বরূপ প্রজাসাধারণ জুতা খুলে হাতে নেওয়ার আর ছাতা বন্ধ করার চল ছিল সে সময়। পাছে ঔদ্ধত্য প্রকাশিত না হয়, সে কারণে মাথা নত করে মৃদু পায়ে জমিদারবাড়ি এলাকা পাড়ি দিতে হতো। খাজনা আদায়ের নামে জমিদারদের অত্যাচার-নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করত প্রজারা। হাতেগোনা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তানরা কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্রিটিশ সরকারের কেরানি বা জমিদারদের সেরেস্তায় কিছু কাজ করার সুযোগ পেত। ম্যাজিস্ট্রেট-উকিল-মোক্তার বা দারোগা যে দু-একজন হয়েছিল নামে তাদের পরবর্তী বংশধররা আজও পরিচিত দারোগাবাড়ি, মোক্তারবাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি নামে। বেসরকারি পর্যায়ে মহাজনের গদিতে হিসাবরক্ষক বা ফড়িয়া-দালালি ধরনের কিছু কাজ পাওয়া যেত। ১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় আটানব্বই শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত। জীবনব্যবস্থা চালিয়ে নেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে হিসাব-নিকাশ শেখার ব্যবস্থা করত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল না, যা ছিল তাতেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল অকিঞ্চিত্কর। অষ্টম শ্রেণির গণ্ডি পেরোলে আন্ডার ম্যাট্রিক পরিচয় ছিল সম্মানের। ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করলেও সমাজে উচ্চ মাত্রার কদর পাওয়া যেত।

এমন এক পরিবেশে পূর্ব বাংলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উঠলে কলকাতার অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযোগ্য শিক্ষার্থীর জোগানের উৎস সম্পর্কে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কৃষক-তাঁতি-জেলে ইত্যাদি উৎপাদক শ্রেণিনির্ভর পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের

বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় রূপান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে অনেকে সন্দিহান  ছিলেন। অবশ্য ১৯২১ সালে ১ জুলাই  ১২টি বিভাগে গড়ে প্রায় ৭৩ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অদ্যাবধি প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছে। জাতি রাষ্ট্রের স্থপতি, প্রথম প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, রাষ্ট্রপতি, স্পিকারসহ রাষ্ট্রের সব শীর্ষপদ অলংকৃত করেছেন এখানকার শিক্ষার্থীরা। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্পিকারসহ অনেক মন্ত্রী প্রশাসনযন্ত্রের অধিকাংশই এখানকার স্নাতক। আধুনিক গণমাধ্যম সৃষ্টিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনবদ্য অবদান রয়েছে। একসময়ের মহাজনি ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় আর সুদের কারবার দুটোই করত।

এই বাংলায় এখন বহু করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমাসহ বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। গড়ে উঠেছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বহু উদ্যোক্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে এখানকার হাজার হাজার প্রাক্তন ছাত্র। সরকারি চাকরি ছাপিয়ে বেসরকারি চাকরিকে আকর্ষণীয় করেছে এসব প্রতিষ্ঠান। কৃষিনির্ভর দেশে এখন অর্থনীতির প্রধান জোগান আসে শিল্প থেকে—এদের কল্যাণে। প্রাথমিক থেকে টারশিয়ারি লেভেল পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা বিনির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান নেতৃত্ব দিয়েছে। এখান থেকে কারিকুলাম আর শিক্ষককের জোগান গেছে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। পরবর্তীকালে অধিবাসীদের মননে রাজনৈতিক রূপান্তরের কাজটি করেছিল এর শিক্ষা-দর্শন। জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, পরিচালনার প্রতিটি পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক কথায় বলতে গেলে, এ জনপদের  মানুষ হিসেবে আমাদের অর্জনের সকল পর্যায়ে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় অবদান।

ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী মাত্র পাঁচ মাইল ক্যাচমেন্ট এরিয়া নিয়ে যে আলোকবর্তিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শতবর্ষব্যাপী সে আলোকরশ্মি ছড়িয়ে দিয়েছে জনপদের প্রতিটি মানুষের হৃদয় থেকে পৃথিবীর সব প্রান্তে। এখানকার স্নাতকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা এ জনপদের অধিবাসীদের মনস্তত্ত্ব নির্মাণেও প্রভাব রেখেছে। উনিশ শ ষাটের দশকের শুরুতে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে একজন ছাত্রের নোয়াখালীর গ্রামে ফিরে যাওয়ার যে গল্প বলেছেন তৎকালীন ইংরেজি বিষয়ের ব্রিটিশ শিক্ষক এ জি স্টক, তার পশ্চাতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোয় গ্রামীণ জনপদকে আলোকিত করার অভিপ্রায়। এ জি স্টক যখন তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘শহরের এত সম্ভাবনা পেছনে ফেলে গ্রামে ফিরে যেতে চাও কেন?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘আমি যদি না যাই, আমার এলাকায় আমার মতো আরেক জন গ্র্যাজুয়েট পেতে আরও ২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এমনই ছিল এখানকার ছাত্রদের অন্যের প্রতি কর্তব্যবোধ।

বর্তমানকালেও সমস্ত প্রাকৃতিক দৈব-দুর্বিপাক, গণতন্ত্রহীনতায়, সংকট-সম্ভাবনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথমে টর্চ জ্বালিয়ে পথ নির্দেশ করে। এরপর অন্যেরা অনুগমন করে। এতৎসত্ত্বেও আরও অনেক কিছু করার ছিল, বাকি আছে আরও করণীয় কাজ। আগামী ১০০ বছরের উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণে আমরা পিছিয়ে গেলে অতীতের স্মৃতিটুকু রোমন্থন করে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া গেলেও শিল্পবিপ্লবের চতুর্থ ঢেউয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। কাজেই এখনই সময় পরবর্তী কর্মযজ্ঞের সময়োপযোগী প্রস্তুতি গ্রহণের। 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা