সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

আধুনিককালে প্রতিযোগিতার ধরন বুঝিতে হইবে

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:০৩

জগৎ সৃষ্টির পর হইতেই মানবজাতি শুধু নহে, পশু সমাজেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান রহিয়াছে। অর্থাৎ জীবনের সহিত প্রতিযোগিতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।  বলা যায়, প্রতিযোগিতার কোনো শুরু নাই, প্রতিযোগিতা লইয়াই আমরা জন্মগ্রহণ করি। আমরা যখন স্কুলজীবনে প্রবেশ করি, সেইখানেই প্রতিযোগিতাটি প্রথম প্রত্যক্ষ করিতে পারি; কিন্তু এই প্রতিযোগিতা স্কুলেই শুরু হয় না। এমনকি মাতৃগর্ভে স্থান করিয়া লইতে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হয়। ইহার অর্থ হইল, আমরা সহজাতভাবেই প্রতিযোগিতার অংশ।

কেবল মানবজীবন নহে, বাঁচিয়া থাকিবার জন্য বনের মধ্যে সকাল-সন্ধ্যা পশুকুল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। আদিম যুগে খাদ্য সংগ্রহের জন্য এবং খাদ্য হস্তগত করিবার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় নামিতে হইত। যে এই প্রতিযোগিতায় নামিবে না, তাহাকে ক্ষুধার্ত থাকিতে হইবে। এই কারণেই বিবর্তনবাদ পড়িয়া ইংরেজ দার্শনিক হার্বার্ট স্পেনসর বলিয়াছিলেন—‘সারভাইবাল ফর দ্য ফিটেস্ট’। অর্থাৎ যোগ্যরাই কেবল টিকিয়া থাকিবে।

ইহা ঠিক, আধুনিক যুগে মানবসমাজে এই প্রতিযোগিতা তীব্র হইয়াছে, পালটাইয়াছে প্রতিযোগিতার ধরন। ইহার পাশাপাশি ব্যক্তির জীবনে যেমন প্রতিযোগিতা রহিয়াছে, তেমনি রাষ্ট্রগুলির মধ্যেও রহিয়াছে প্রতিযোগিতা। বিশেষ করিয়া বর্তমান যুগে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা অধিক তীব্র হইয়া উঠিয়াছে। এই প্রতিযোগিতা ধনী-দরিদ্র—সকল দেশেই বিরাজমান। তবে ইহা মনে রাখা দরকার যে, এই প্রতিযোগিতার জন্য নিষ্ঠা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। পরিশ্রমী প্রতিযোগী সর্বদা চূড়ান্ত শিরোপা হাতে না পাইলেও তাহার প্রতিযোগিতা বৃথা যায় না।

পৃথিবীতে এখন অধিক বৈচিত্র্যময় পেশা রহিয়াছে। যিনি যেই পেশাতেই থাকুন, নিজের পেশায় নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও মনোযোগ থাকিলে অবশ্যই তিনি সফলকাম হইবেন। এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হইয়া ভাগ্যান্বেষণের কোনো সুযোগ নাই। এই সম্পর্কে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থেও রহিয়াছে সুস্পষ্ট উচ্চারণ। সুরা রাদ-এ বলা হইয়াছে, ‘তাহার (মানুষের) জন্য তাহার সম্মুখভাগে এবং পশ্চাদ্ভাগে সার্বক্ষণিক প্রহরী নিযুক্ত রহিয়াছে, যে আল্লাহর নির্দেশে তাহাকে রক্ষা করে; এবং আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তাহারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না ঘটায়।’ ইংরেজিতে একটি কথা রহিয়াছে, ‘তুমি সকল সময় প্রতিযোগিতায় প্রথম হইবে তাহা নহে; কিন্তু তোমাকে সত্যিকার প্রতিযোগী হইতে হইবে।’

আধুনিক যুগে, বিশেষ করিয়া শিল্পবিপ্লবের পর মনুষ্যসমাজে যতই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হইয়াছে, ততই প্রতিযোগিতা তীব্র হইয়াছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইহাই সাক্ষ্য দেয় যে, যাহারা প্রতিযোগিতায় নামিতে নারাজ তাহাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হইয়া পড়া স্বাভাবিক বিষয় হইয়া গিয়াছে। ইহা ঠিক, বর্তমান করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু বাংলাদেশ নহে, সমগ্র বিশ্বেই মন্দা অবস্থা তৈরি হইয়াছে এবং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র আরও তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। বহু দেশে শুধু জীবন নহে, অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সরকারগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায় তাহাদের উৎপাদন ও সরবরাহ লইয়া বিপাকে রহিয়াছে; কিন্তু তাহার পরও যদি নিষ্ঠার সহিত, সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়া কেহ আগাইয়া যায়, নিজের প্রতি আস্থা রাখিতে পারে তাহা হইলে বিফল হইবার সম্ভাবনা থাকে না। উল্লেখ্য, পেশাগত জীবনের সকল ক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা, তাহা হউক কেরানির চাকুরি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, উত্পাদনমুখী ব্যবসা অথবা কোনো এনজিওর চাকুরি।

বর্তমান যুগের এই প্রতিযোগিতায় যেই সকল গুণাবলি প্রয়োজন তাহার অন্য একটি হইল ধৈর্য। ধৈর্য কেবল একটি মানবিক গুণই নহে, ইহা মানুষের বিপৎসংকুল অবস্থায় দাওয়াইয়ের কাজ করিয়া থাকে। সুতরাং করোনাকালের বর্তমান পরিস্থিতি যতই দুঃসংবাদ বহিয়া আনুক, ধৈর্য, নিষ্ঠা ও সঠিক ব্যবস্থাপনাই যে উত্তরণ ঘটাইতে বড় ধরনের সাহায্য করিতে পারে তাহা সকলকে মনে রাখিতে হইবে।     

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ দায়িত্ব পালন

প্রতিশ্রুতি প্রদানে সতর্ক হওয়া উচিত

অস্পষ্টতা গুজব সৃষ্টির সহায়ক

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত

প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না