সন্ধ্যার আকাশ তখন কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে আবৃত। জাতীয় জাদুঘরের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মিলনায়তনে বর্ণিল এক অনুষ্ঠানে প্রবেশ ঘটল জলের গানের শিল্পী রাহুল আনন্দের। গ্যালারিতে থাকা একঝাঁক ভ্রমণকন্যাদের মাঝে শোরগোল পড়ে গেল এ নিয়ে। রাহুল আনন্দ মাইক্রোফোন হাতে শুরু করলেন তাঁর ভ্রমণ পিপাসার গল্প। খানিক পরেই গাইলেন, 'ও ভ্রমণকন্যা গো, পাহাড়ে, সমুদ্রে জাগো/ সবুজ মাঠে সিঁথকাটা পথ, তোমার চরণ ধুলায় ধন্য গো/ ও ভ্রমণকন্যা গো'। সঙ্গে গলা মেলালেন দর্শকসারির ভ্রমণকন্যারা। জাদুঘর মিলনায়তন পরিণত হলো এক আনন্দোৎসবে।
বলছিলাম ভ্রমণপিপাসু নারীদের সংগঠন 'ভ্রমণকন্যা'র পঞ্চম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের কথা। সংগঠনটি পাঁচ বছর পূর্ণ করে এবার ছয়বছরে পা রেখেছে। এ উপলক্ষে গত ২৭ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরে এক আড়ম্বর অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রধান অতিথি হিসেবে এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। কেক কাটা ও ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ' বা সংক্ষেপে 'ভ্রমণকন্যা’ নামের এ সংগঠনটি দেশের নারীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ও সর্ববৃহৎ ভ্রমণ সংগঠন। ভ্রমণসহ নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা। ইতোমধ্যে নারীদের ক্ষমতায়নে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে সংগঠনটি।
সবার কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরপরই সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য ও সংগঠন পরিচির ভিডিও প্রদর্শনী করেন সংগঠকরা। রাহুল আনন্দের গান আর ভ্রমণকাহিনীর গল্পে বিমোহিত হন সকলে। তারপর একে একে বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, এই সংগঠনটি নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রযাত্রা নিয়ে কাজ করছে। ২০১৬ সালে সাহসী তরুণ মানসী সাহা ও সাকিয়া হকের হাত ধরে এর যাত্রা। ইতোমধ্যে ৬২ হাজার নারী এতে যুক্ত হয়েছেন। সারা জাগানো এই পথচলা প্রশংসার দাবি রাখে।
আলোচনার পর ‘ভ্রমণকন্যা’ ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নারীদের ভ্রমণের গল্পগুলোকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রয়াসেই এই ম্যাগাজিনটি যাত্রা করেছে। এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আয়োজন করা হয় ভ্রমণবিষয়ক লেখালেখির প্রতিযোগিতা। ইংরেজি বা বাংলাতে যেকোনো বয়সী নারীর সুযোগ ছিল সে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের। মাসব্যাপি চলমান সে প্রতিযোগিতায় প্রায় ১১২ জনের নারী অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বিচারকরা সেরা ১৫ জনকে নির্বাচন করেন। বিচারক হিসেবে ছিলেন— উন্মাদ ম্যাগাজিনের সম্পাদক কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব, তারেক অণু ও রাকিব কিশোর। নির্বাচিত লেখাগুলো ম্যাগাজিনে স্থান পেয়েছে। এখানে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মমতাজ জাহানের লেখা রয়েছে, তেমনি মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া নাফাসাত নুজহাত সামারা’র মতো খুদে পর্যটকদের লেখাও স্থান পেয়েছে ভ্রমণকন্যা ম্যাগাজিনে।
ভ্রমণকন্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডা. সাকিয়া হক বলেন, ‘ভ্রমণ নিয়ে বাংলাদেশের নারীদের অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থাকতে হয়। আমি নিজেও ছোটবেলায় পরিবার থেকে সে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছি। বর্তমানে আমরা এর থেকে অনেকটাই বেরিয়ে এসেছি। নারীদের ক্ষমতায়নে, অধিকার আদায়ে, কিংবা বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্য সচেতনতায় কাজ করছি। আমাদের সাথে এখন সারাদেশের নারীরা যুক্ত হচ্ছে। আমাদের কর্মসূচিতে আগামী পাঁচ বছরে দেশের আড়াই লাখ নারীকে জেন্ডার ইক্যুয়েলিটি অ্যান্ড উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে সচেতন করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।’
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ‘পরিচ্ছন্ন ভ্রমণ’ নামে নতুন একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন সংগঠনটি। এতে তারা দেশের নানা প্রান্তে ঘুরতে যাওয়ার সময় সেখানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে আবারও মঞ্চে গানের ঝড় ওঠে। গান পরিবেশন করেন ব্যান্ড দল কুঁড়েঘর ও আপন ব্যান্ডের শিল্পীরা। শিল্পীদের তালে সুর মিলিয়ে ভ্রমণকন্যাদের অনুষ্ঠানের পর্দা নামে।
প্রসঙ্গত, ‘এম্পায়ার উইমেন থ্রু ট্র্যাভেলিং’ স্লোগান ধারণ করে ২০১৬ সালে ডা. সাকিয়া হক ও ডা. মানসী সাহা’র হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ-এর। শুরুর দিকে স্কুটি হাকিয়ে দেশের ৬৪ জেলায় ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ' নামক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে স্কুলে পড়ুয়া নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা, মাসিক, প্রজনন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয় জানানোর কার্যক্রম করেছেন তারা।
