মানুষ যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করে, ইতিহাসের ঘটনাবলি গ্রন্থনা করে, তেমনই ইতিহাসও কোনো কোনো মানুষকে তার অন্তর্গত করে নেয়। কেননা সে মানুষ ইতিহাসের অংশে পরিণত হন। বাঙালি জাতির স্বাধিকার চেতনার অনির্বাণ মশাল যে একুশে ফেব্রুয়ারি, সেই ফেব্রুয়ারির শোকাবহ ঘটনাকে প্রথম কবিতা করে তুলেছিলেন যে কবি, তিনি অবশ্যই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি... শিরোনামে যে দীর্ঘ কবিতা তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে রচনা করেছিলেন তা বাংলা সাহিত্যে আজ স্থায়ী সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা দেশটির অন্যতম রাষ্ট্রভাষাও হবে না তা কি কেউ মেনে নিতে পারে! অনিবার্য কারণেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারি চুুয়াল্লিশ ধারা লংঘন করে বাংলার প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ তত্কালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে বেরোতেই ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ মিছিলে এলোপাথারি গুলি চালিয়ে দেয়। রাজপথে ঢলে পড়ে রফিক উদ্দিন, শফিউর, বরকত, সালাম, জব্বার-এর মতো একঝাঁক তরুণতাজা প্রাণ। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে সারাদেশ। সেই শোক আর ক্ষোভের অভিঘাত মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও। সেইসময় চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মী তরুণ কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী জলবসন্তে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। সে অবস্থায়ই তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লিখে ফেললেন এক অমর কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি...।’ সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম ‘একুশের চারণ’ শীর্ষক এক রচনায় এই কবিতার প্রেক্ষাপট জানাতে গিয়ে লিখেছেন—‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী সাধারণ্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৫২- তে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি...’ কবিতার জন্যে। ‘সে কবিতার কবিতা রচনার কাহিনী ও পরিণাম রহস্য সিরিজের রোমাঞ্চকর কাহিনীর মতো মনে হয়। ভাষা আন্দোলন কমিটির আহবায়ক মাহবুব যখন ঢাকায় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর পেলেন তখন তিনি জলবসন্তে শয্যাশায়ী। তড়িত্স্পৃষ্ট হয়ে উঠে বসলেন তিনি এবং ছাত্র ফেডারেশনের তরুণ কর্মী ননী ধরকে দিয়ে প্রায় সতেরো পৃষ্ঠার লম্বা কবিতা শ্রুতলিখনের মাধ্যমে লিখিয়ে নিলেন। সাক্ষী ছিলেন ঢাকা থেকে প্রেরিত বামপন্থি নেতা খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। ইলিয়াসের ওপরই দায়িত্ব ন্যস্ত হয় আন্দরকিল্লার কহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসে সারারাত কাজ চালিয়ে সকালের মধ্যেই কবিতাটি পুস্তিকাকারে প্রকাশ করতে। কম্পোজ ও প্রুফ দেখার কাজ প্রায় শেষ তখন এসপি আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে পুলিশ প্রেসে হানা দিল। স্বাদেশিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত প্রেস শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীরা কবিতার পাণ্ডুলিপি, মুদ্রিত কপি এবং তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস-সহ সবকিছুই লুকিয়ে ফেললেন। আর পুলিশ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছাপার কাজ গোপনে সমাধা করে কয়েক হাজার কপি তৈরি করেন।’ (‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী এক অবিস্মরণীয় কবিতার জনক’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা ২১)। একই রচনায় এই কবিতার প্রভাব সম্পর্কে তিনি আরো জানান—“চট্টগ্রাম দোকান কর্মচারী সমিতি দাবী-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে লালদীঘির ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করেছিলেন। শ্রমিকনেতা চৌধুরী হারুণ-উর-রশিদ বক্তব্য দিতে উঠে বললেন, শ্রেণীগত দাবী-দাওয়া সব গৌণ হয়ে গেছে ঢাকায় ভাষা সৈনিকদের ওপর বর্বরোচিত গুলিবর্ষণে। সঙ্গে সঙ্গে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সেই ক্রুদ্ধ পঙিক্তগুলো তিনি পড়ে শোনান এবং কর্মীরা কয়েক হাজার কপি জনসভায় বিক্রি করেন। সমবেত জনতা ফাঁসির দাবীতে ফেটে পড়ে বিক্ষোভ মিছিলে বেরিয়ে পড়েন, মুখে তাদের গগনবিদারী আওয়াজ ‘চল, চল, ঢাকা চল’। মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সব কপি বাজেয়াপ্ত করে নেয়।”
আমাদের সবারই জানা একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলি করে ঢাকায় ছাত্রহত্যার ঘটনা সারাদেশে গণবিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ক্ষোভে-দুঃখে-শোকে থমকে যায় সমগ্র জাতি। বাংলার বুকে নেমে আসে থমথমে বিষাদের অন্ধকার। সেই থমকে যাওয়া শোকার্ত মুহূর্তই মাহবুব উল আলম চৌধুরী বাঙ্ময় করে তুলেছিলেন সেই দীর্ঘ প্রতিবাদী কবিতার ক্ষুব্ধ উচ্চারণে— “... নজরুলের ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি’
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজাপ্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।...
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্য
আমি ফাঁসি দাবী করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবী করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।...”
যে তীব্র ক্ষোভ আর ঘৃণায় পাকিস্তানি দুঃশাসন আর তাদের লেলিয়ে দেয়া রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তির বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলার মানুষের প্রাণের ঘৃণা ঐ কবিতায় কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী তুলে এনেছেন, তা সেই দুঃসময়ে শুধু দুঃসাহসিক কাজই নয়, প্রায় অকল্পনীয় ঘটনাও। গভীর দেশপ্রেম আর মাতৃভাষা প্রেমের আবেগে থরোথরো এই দীর্ঘ কবিতা রচনা করে তিনি নিজেরই অজান্তে ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হয়ে গেছেন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, যতবার একুশে ফেব্রুয়ারি প্রসঙ্গ আসবে, ততবার তাঁর এই অমর কবিতা আসবে, তাঁর নাম আসবে। যেমন অমর হয়ে গেছেন একুশের প্রথম সাহিত্য সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সম্পাদনার জন্য কবি হাসান হাফিজুর রহমান, প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান, যেমন অমরতা পেয়েছেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী/আমি কি ভুলিতে পারি’ গানের গীতিকবি সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ও সুরস্রষ্টা শহিদ আলতাফ মাহমুদ।
অনেকের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে, সুদূর চট্টগ্রামে বসে কেন একুশের প্রথম কবিতা মাহবুব উল আলম চৌধুরীর হাতেই রচিত হলো? তাঁর চেয়ে খ্যাতিমান এবং অগ্রজ, সমসাময়িক অনেক কবিই তো ছিলেন, তারপরও চট্টগ্রামবাসী এক তরুণ কবির কাছ থেকে কেন এল এই ঐতিহাসিক সৃষ্টি? এর কারণ, মাহবুব উল আলম চৌধুরী অতি তরুণ বয়স থেকেই চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে যে সশস্ত্র সংগ্রাম তথা ইন্ডিয়ান রিপাবলিক আর্মি গড়ে উঠেছিল তার কেন্দ্রভূমি তো চট্টগ্রাম। সেই চট্টগ্রামেরই সন্তান কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে আমরা দেখি কৈশোর থেকেই তিনি প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক প্রতিটি আন্দোলনে সম্মুখভাগে। যখন ছেচল্লিশে দাঙ্গাবিরোধী প্লাটফর্ম গড়ে ওঠে, চট্টগ্রামে নজরুল জয়ন্তী উদ্যাপনে গঠিত হয় কমিটি, তাতে সভাপতি অধ্যপক আবুল ফজলের পাশেই সম্পাদক হিসেবে দেখি কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে। সাতচল্লিশে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের অপশাসনে এখানে বাংলা ভাষার ওপর আঘাত, প্রগতির পথ রুদ্ধ, তখনই কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী আর সুচরিত চৌধুরী মিলে এক অসামান্য সাহিত্য পত্রিকা ‘সীমান্ত’ প্রকাশ শুরু হয়। পত্রিকাটি পাঁচ বছর টিকে ছিল, মুক্তচিন্তার বাহন হিসেবে দুই বাংলায় পেয়েছিল ব্যাপক খ্যাতি। শুধু তা-ই নয়, পূর্ববাংলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সাংস্কৃতিক সম্মেলন (১৯৫১)—যেখানে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। চট্টগ্রামের সর্বদলীয় ভাষাসংগ্রাম পরিষদ গঠন সবকিছুতেই অগ্রণী কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। সেই ১৯৪২ সালেই ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ‘ছাত্র-কংগ্রেস-এর’ সদস্য অতি তরুণ বয়সে, ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন ১৯৪৫ সালে, ঐ বছরই চট্টগ্রামে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে তিনি চট্টগ্রাম প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘের সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ বাংলা সাহিত্যের স্বনামখ্যাত প্রগিতিশীল লেখক-শিল্পীদের অনেকেই। ১৯৪৯ সালে কলকাতার দেশবন্ধু পার্কে অনুষ্ঠিত বিশ্ব-শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শহীদ সাবের আর তিনি। ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট ঘটিত হলে সেখানেও তাঁকে দেখি সাহসী কর্মীর ভূমিকায়। সে জন্যই পরের বছর যুবলীগের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হন তিনি।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ভূমিকা এক কথায় অসাধারণ। ১৯৪৪ থেকে ৪৬ সালের মধ্যে তাঁর যে তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তাতেও মানবতাবাদী এক প্রগতিশীল কবিরই কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত। সঙ্গত কারণেই একুশের প্রথম কবিতা তো তিনিই লিখবেন। এছাড়াও ‘মিসরের মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘বিপ্লব’-এর মতো গণজাগরণমূলক গদ্যের বই লিখে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। বিপ্লব বইটি পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। প্রগতির যে মশাল তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা প্রজ্জলিত রেখে গেছেন। তাই এখানেই তাঁর অমরতা।
