আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩৬

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে প্রথম কবিতাটি লিখেছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’। এরপর একে একে আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ থেকে শুরু করে দেশের বরেণ্য অনেক কবিই লিখেছেন কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস যা আমাদের আজও অনুপ্রাণিত করে।

এক্ষেত্রে আল মাহমুদ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ শিরোনামে যে কবিতাটি লিখেছিলেন, এখন পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখিত  উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর অন্যতম। কবিতাটি তাঁর ‘পাখির কাছে, ফুলের কাছে’ বইটিতে রয়েছে। এ কবিতাটিকে কেউ কেউ গান হিসেবেও গেয়েছেন। কয়েক দিন আগেই ইউটিউবে শুনছিলাম প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া কবিতাটি। প্রতুলের কণ্ঠে কবিতাটির প্রতিটি শব্দ যেন শরীরের ভেতর ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। মৌখিক বা আঞ্চলিক শব্দের উচ্চারণকে আল মাহমুদ কবিতায় যে মুন্সিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করতে পেরেছেন, এটা সর্বজন স্বীকৃত। এর স্বাক্ষর তাঁর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতাটিতেও আছে—

 

‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ

দুপুর বেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?     

বরকতের রক্ত।

 

হাজার যুগের সূর্যতাপে

জ্বলবে এমন লাল যে,

সেই লোহিতেই লাল হয়েছে

কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!

 

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে

ছড়াও ফুলের বন্যা

বিষাদগীতি গাইছে পথে

তিতুমীরের কন্যা।

 

চিনতে না কি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরামকে চিনতে?

রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে

মুক্ত বাতাস কিনতে?

 

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়

ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,

ফেব্রুয়ারির শোকের বসন

পরলো তারই ভগ্নী।

 

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী

আমায় নেবে সঙ্গে,

বাংলা আমার বচন,

আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।’

‘অক্ত’ একটি মৌখিক আটপৌরে শব্দ, এ শব্দটি কবিতাতে যে এমন নিখুঁতভাবে ব্যবহার সম্ভব এবং এর সঙ্গে ‘রক্ত’ শব্দের অন্ত্যমিল হয় তা আল মাহমুদই দেখাতে পেরেছেন। ‘অক্ত’ শব্দটিকে আভিজাত্য দান করেছেন তিনি। এছাড়া কবিতাটিতে পুরো একুশের প্রসঙ্গ যেভাবে উঠে এসেছে, অনুভূত হয় আমি নিজে যেন ওই ঘটনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দুপরের গনগনে রোদের ভেতর বরকতের রক্ত যেন ছিটকে এসে আমাদের গায়ের ওপরে পড়ছে।

কিশোর বয়সে একুশে ফেব্রুয়ারির আগের রাতে সারারাত জেগে শহিদ মিনার তৈরিতে অংশ নিতাম। দল বেঁধে বিভিন্ন ফুলবাগান থেকে ফুল নিয়ে আসতাম শহিদ মিনারের জন্য। ভোর হতেই দেখতাম শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্কদের শহিদ মিনারে ফুল দিতে আসতে। আর এ সমস্তই ঘটত স্বতঃস্ফূর্তভাবে। প্রশ্ন জাগে, আমার জন্মেরও ২৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহিদ মিনার তৈরির সময় কিংবা শহিদ মিনারে ফুল দেওয়ার সময় প্রাণের ভেতর যে আবেগ কাজ করে, সে আবেগের উত্স কোথায়? কবিতাটির প্রথম প্যারার পরে যখন একে-একে তিতুমীর, ক্ষুদিরাম বা প্রভাতফেরির প্রসঙ্গ আসে, টের পাই ছন্দের তালে তালে করোটির ভেতর বাজছে দেশ ও ভাষাপ্রেমের রণসংগীত।

আল মাহমুদের ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে, কিন্তু শেষ জীবনে তিনি যে দলটির ঘনিষ্ঠ ছিলেন, হুমায়ুন আজাদ ঠিক এ কারণেই ঘোষণা দিয়ে তাঁর সম্পাদিত কাব্যসংকলন থেকে আল মাহমুদকে বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন কবিতাপ্রেমী হিসেবে আমি তাঁকে বাদ দিতে পারিনি, একজন প্রকৃত কবির কবিতাকে আমার পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব না। একালের একজন কবিতা লিখিয়ে হিসেবে আল মাহমুদকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হিসেবে শ্রদ্ধা করি। তাঁর কবিতাতে যতটা না দেখেছি তাঁর দলীয় বিশ্বাসের ছাপ, তার চেয়েও অনেক বেশি দেখেছি মানুষের কথা, দেশের কথা। আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রকৃত কবি কখনোই মানুষের বিপক্ষে যেতে পারেন না। একজন ভূপেন হাজারিকা, যিনি গেয়েছিলেন ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’—তিনি যে দলেই যোগদান করুক না কেন আমার কাছে তিনি মানবতাবাদীই। আমি জানি, দূর থেকে বা বাইরে থেকে মোটা দাগে যা দেখা যায় কিংবা দেখানো হয়, ভেতরের চিত্র হয়তো ভিন্ন রকম হতেও পারে। আল মাহমুদ, যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছিলেন, কেন তিনি পরে বিগড়ে গিয়েছিলেন—এটা আমার কাছে আজও বড় ধাঁধা। নিশ্চয় সময় একদিন সব ধাঁধার সমাধান করে দিবে। রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডা দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু প্রকৃত পাঠকের মনে জায়গা করা যায় না। কবি বেঁচে থাকেন কবিতার শক্তি দিয়েই।