শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:৪৭

ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে বাংলাদেশ হইতে পারে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে রচনা করিতে পারে সেতুবন্ধ। উন্নত ও আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপনের মাধ্যমে আমরা এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারি। বিশেষ করিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়াররুট বাংলাদেশের কক্সবাজারের উপর দিয়া যাইতেছে বিধায় কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। ইতিমধ্যে এই বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার বিমানবন্দর বিশ্বের সবচাইতে আকর্ষণীয় রিফুয়েলিং হাব হিসাবে গড়িয়া উঠিবে বলিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছেন কয়েক মাস পূর্বে। এই বিমানবন্দরটি হংকং, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দুবাই প্রভৃতি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো হইতে পারে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ আজ এই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা লইয়া দেখা দিয়াছে প্রশ্ন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের আশপাশে চরা দুইটি গরুর সহিত বিমান বাংলাদেশের একটি উড়োজাহাজের পাখার ধাক্কা লাগে। ইহাতে ঘটনাস্থলেই গরু দুইটি মারা যায়। এই বিমানে ৯৪ জন আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করিতে পারিত। নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হইয়া বিমানবন্দর রানওয়েতে কীভাবে গরু-ছাগল বা মানুষ ঢুকিতে পারে তাহা একটি বড় ও বিস্ময়কর প্রশ্নই বটে। আন্তর্জাতিক অথবা অভ্যন্তরীণ কোনো বিমানবন্দরের সামান্য নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিকে অবহেলার চোখে দেখিবার কোনো অবকাশ নাই।

আমাদের বিমানবন্দরগুলির উন্নয়নে এই সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে। বিমানবন্দরের জন্য অত্যাধুনিক রাডারও ক্রয় করা হইতেছে। অথচ বিমানবন্দরগুলির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারের ব্যাপারে আমাদের সীমাহীন উদাসীনতা পরিলক্ষিত হইতেছে। শুধু কক্সবাজার নহে, অন্যান্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তা লইয়াও রহিয়াছে বিস্তর অভিযোগ। মোট আটটি বিমানবন্দরের মধ্যে বলা যায় পাঁচটিরই সীমানাপ্রাচীর অরক্ষিত। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলির নিরাপত্তাব্যবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনক হইলেও রাজশাহী, বরিশাল, সৈয়দপুর, যশোর ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ত্রুটিমুক্ত নহে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের প্রাচীর সংস্কার না করায় ভাঙা অংশ দিয়া মানুষ ও পশু চলাচল করিতেছে অবাধে। ২০১৭ সালে এখানকার রানওয়েতে তিনটি কুকুরের মৃত্যু হয়। রাজশাহী হজরত শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে ঘাস কাটে নারী-পুরুষেরা। দেওয়াল টপকানোর জন্য এইখানে রাবিশ ফেলিয়া উঁচু করা হইয়াছে। বরিশাল বিমানবন্দরে দেওয়ালের নিচে করা হইয়াছে বড় বড় গর্ত। এই ফাঁক গলিয়া ঢুকিয়া পড়িতেছে লোকজন। এখানে রাত্রে আলোর ব্যবস্থা নাই। নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে নাই আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের পর্যাপ্ত ও আধুনিক যন্ত্রপাতি। নীলফামারির সৈয়দপুর বিমানবন্দরে কাঁটাতারের বেড়ায় ফাঁক সৃষ্টি করা হইয়াছে। যশোর বিমানবন্দরের সীমানাপ্রাচীর জরাজীর্ণ। সেইখানে দেখা যায় শিয়ালের উত্পাত। রানওয়েতে উড়োজাহাজের নিচে পড়িয়া শেয়াল মারা যাইতে দেখা যায়। সিলেট বিমানবন্দরের সীমানাপ্রাচীরের নিচ দিয়া তৈরি করা হইয়াছে সুড়ঙ্গ। এই সকল পরিস্থিতি দেখিয়া প্রশ্ন উঠিতে পারে, তাহা হইলে এই বিমানবন্দরগুলির নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ করেন কী? তাহারা দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার কি ঊর্ধ্বে?

বিমানবন্দরকে বলা হয় দেশের মুখ। বিমানবন্দরগুলির সার্বিক নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও সুব্যবস্থা দেখিয়া একটি দেশ সম্পর্কে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভালোমন্দ ধারণা জন্মায়। গড়িয়া উঠে ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাবমূর্তি। এই জন্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তাগত ত্রুটির কারণে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ কার্গো বিমান চলাচল একসময় নিষিদ্ধ করিয়াছিল। ইহাতে আমাদের প্রভূত অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়; কিন্তু আমরা ইহা হইতে কি কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছি? বিমানবন্দর দেশের সবচাইতে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে অবশ্যই সর্বপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। শুধু প্রবেশপথ নহে, সীমানাপ্রাচীর হইতেও যাহাতে কোনো প্রকার নিরাপত্তাহীনতা তৈরি না হয়, নজর দিতে হইবে সেই দিকেও।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না

‘ক্ষীণছন্দ মন্দগতি তব রাত্রিদিন’ 

অর্থনৈতিক সংকট লইয়া নীতিনির্ধারকদের ভাবিতে হইবে

ভোটের বহুবিধ মূল্য জনগণকে বুঝিতে হইবে