সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

মওলানা, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগঠন

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:৪৬

কার সঙ্গে আর কলমযুদ্ধে নামব? তা রাজনীতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান যাই হোক। যাদের সঙ্গে লড়তাম, তারা সবাই চলে গেছেন। কবে নিজে চলে যাব তার ঠিক নেই। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে যাদের সঙ্গে লড়েছি, তাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছিও। এখন সেই শিক্ষাদানের কেউ নেই। শিক্ষা যে দেব, এমন কাউকেও দেখি না। জীবনের চারদিকে তাকিয়ে দেখি, এই চারদিক কেবল শূন্যতায় ভরা। বন্ধুবর ড. রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর ওপর লিখতে না লিখতেই আরেক বন্ধুর মৃত্যু সংবাদ পেলাম। হাসান আজিজুল হক। ড. রফিক ছিলেন আমার সমবয়সি শিক্ষাবিদ। হাসান আজিজ ছিলেন সাহিত্যিক। কয়েক মাস আগেও টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমার আগেই চলে যাবেন বুঝতে পারিনি। তার উপন্যাস পড়ে তাকে আমি উপাধি দিয়েছিলাম পূর্ব বাংলার তারাশংকর। ড. রফিক ও হাসান আজিজকে নিয়ে বিভিন্ন জনের ওবিচুয়ালি পড়ছি, হঠাৎ ঢাকার কাগজে একটি লেখা চোখে পড়ল। শিরোনাম ‘মওলানা, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগঠন’। লেখক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বিখ্যাত প্রাবন্ধিক আমার বন্ধওু বটে। তবে বয়সে কিছুটা কম, কিন্তু পাণ্ডিত্যে অনেক ভারী। আমি তার মতামতের সঙ্গে সব সময় ঐকমত্য পোষণ করি না, কিন্তু তার লেখা হাতে পেলেই পড়ি।

ঢাকার একটি কাগজে প্রকাশিত লেখাটি মন দিয়ে পড়লাম। মওলানা ভাসানীর এখন মৃত্যুবার্ষিকীও পালিত হচ্ছে। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান দুই সম্পর্কেই সিরাজুল ইসলামের পাণ্ডিত্য প্রখর। তাই ‘মওলানা, মুক্তিযুদ্ধ ও সংগঠন’ শীর্ষক তার লেখাটি ঢাকার কাগজে দেখামাত্র পড়লাম। লেখাটা পড়তে গিয়ে প্রথম লাইনেই হোঁচট খেলাম। তাতে লেখা হয়েছে, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মওলানা ভাসানীই প্রথম বলেছিলেন সেই ১৯৫৭ সালে, কাগমারি সম্মেলনে। তখন তিনি আওয়ামী লীগের নেতা। সত্তরের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের পর আবারও তুলেছিলেন কথাটা পল্টনের জনসবায়।’

প্রবন্ধের প্রথম প্যারাতেই ধাক্কা খেলাম। আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে আমি বহুকাল ধরে জড়িত। ১৯৫৭ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের কোনো কথাই ওঠেনি। উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের কথা। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতভেদ ঘটেছিল স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে। আওয়ামী লীগের বামপন্থি সদস্যদের চাপে মওলানা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ নামে নতুন দল গঠন করেন।

সত্তরে বাংলাদেশে কোনো প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় হয়নি। হয়েছে ঊনসত্তরের নভেম্বরে। তারপর মওলানা ভাসানী পল্টনের এক জনসভায় বক্তৃতায় স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি তোলেননি। তার কথা ছিল ‘পাকিস্তানের সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের গরিব জনসাধারণের ন্যায্য দাবি-দাওয়া না মানলে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম অংশকে ওয়াআলাইকুম সালাম জানাতে বাধ্য হবে। পূর্ব পাকিস্তান হবে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান।’

মওলানার এই ভাষণ এত বিখ্যাত যে ভুল করার অবকাশ কম। তাহলে মওলানার এই যে মুষ্টিমেয় অনুসারী দেশে আছেন, তাদের প্রতিনিধি হয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কি মওলানার চরিত্র ধুয়ে-মুছে তাকে স্বাধীন বাংলার স্বাপ্নিক বানাতে চান? বানাতে চাইলে আপত্তি নেই, কিন্তু ইতিহাস তাতে আপত্তি জানাবে। স্বাধীন বাংলা ও স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবির মধ্যে পার্থক্য অনেক। মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে ভারতের দুই প্রান্তে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। জিন্নাহ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি কনভেনশনে ...ভাবে states শব্দ থেকে s তুলে দিয়ে পাকিস্তানকে ইউনিটারি স্টেট (এককেন্দ্রিক) করার ব্যবস্থা করেন।

তখনকার পূর্ব পাকিস্তান (অবিভক্ত বাংলাদেশ) প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম আপত্তি উত্থাপন করেন এবং স্বাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের কথা তোলেন, কিন্তু তাতে সায় দেননি। তখনকার উপমহাদেশের ভুল রাজনীতি বিবেচেনা করে কংগ্রেসের শরৎ বসু ও মুসলিম লীগের আবুল হাশেম মিলে স্বাধীন যুক্ত বাংলার প্রস্তাব তোলেন। লীগ ও কংগ্রেস প্রথমে এই প্রস্তাবে আমল দিলেও পরে তা প্রত্যাখ্যান করে। এদিক থেকে স্বাধীন বাংলার প্রথম স্বাপ্নিক অগ্নিপুরুষ আবুল হাশিম। এই আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তখন মুসলিম লীগের যে প্রগতিশীল অংশ ছিল, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই প্রগতিশীল ধারার অনুকরণীয়। আবুল হাশিমের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলা গঠনের আরেক স্বপ্ন ও উত্তরাধিকার লাভ করেন।
স্বাধীন বাংলা গঠনের আরেক স্বাপ্নিক ছিলেন ফজলুল হক। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের কাছ থেকে তিনি রাজনীতিতে ...... জাতীয়তার মন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন। জিন্নাহর সঙ্গে তার মূল বিরোধের কারণ এখানেই। জনগণ ভারত আক্রমণ করার পর ব্রিটিশ সরকার ভারত রক্ষা কাউন্সিল করে। তাতে দুই বৃহত্তর প্রদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এই দুই প্রধানমন্ত্রী হলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক এবং পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী সিকন্দার হায়াত খান।

মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহ তাতে আপত্তি জানান। তিনি দুই প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে জানান, মুসলিম লীগের অনুমতি ছাড়া মুসলিম লীগ সরকারের দুই প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ সরকারের ভারত রক্ষা পরিষদে যোগ দিতে পারেন না। জিন্নাহর চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যার সেকন্দার হায়াত খান ভারত রক্ষা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু ফজলুল হক পদত্যাগ করেননি। তিনি জিন্নাহর চিঠির জবাবে জানান, বাংলাদেশ প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অঙ্গরাষ্ট্র নয়। বরং আলাদা স্বাধীন ইউনিট হবে। এই ইউনিটের প্রধানমন্ত্রীর পাকিস্তানের পশ্চিম অংশের কোনো ব্যাপারে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া জাপানের যুদ্ধে যোগ দিয়ে রেঙ্গুন দখল করে ইসকল--------পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া এবং কলকাতায় বোমা বর্ষিত হওয়ার পর দেশরক্ষা সমস্যাটা বিশেষভাবে বাংলাদেশের হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যুক্ত পারিষদের বাইরে থাকতে পারেন না।

হক সাহেবের চিঠি পেয়ে ক্রুদ্ধ জিন্না তাকে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার করেন। হক সাহেব কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসত্তা মিলে প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। পরবর্তী ইতিহাস বর্ণনার প্রয়োজন এখানে নেই। স্বাধীন ও যুক্ত বাংলার কথা ওঠে আবার অবিভক্ত বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত মুসলিম লীগ সরকারের আমলে। মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল খাজা নাজিমউদ্দীন ও মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে এই দাবিকে ইসলাম ও মুসলানদের প্রতি বিশ্বাসঘাকতা বলে প্রচার করায় আপাতত এই দাবির প্রতি জনসমর্থন হ্রাস পায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষা এবং পরে গোটা দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পূর্ব পাকিস্তানের জনদাবি হয়ে দাঁড়ায়।

এ সময় প্রশ্ন ওঠে, পূর্ব পাকিস্তানের নাম কী হবে? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পল্টনের ময়দানে দাঁড়িয়ে প্রথম প্রকাশ্যে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় হবে বাঙালি। তার নেতৃত্বেই বাংলার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু হয়। এই সময় আওয়ামী লীগের রক্ষণশীল অংশ ভীত হন। তাদের সাম্প্রদায়িক চেতন এই ভেবে ভীত হন যে দুই বাংলা এক হয়ে যাবে। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে তাদের অনেক ভীতি ছিল। অথচ স্বাধীন বাংলার দাবিও ঠেকানো যাবে না। সুতরাং জনগণের দাবিকে অন্য পথে ঘোরানোর জন্য আওয়ামী লীগের রক্ষণশীল গ্রুপ মুসলিম বাংলার দাবি তোলে। মুসলিম বাংলার দাবি অনুযায়ী বাংলার মুসলমানেরা হবে হিন্দুদের চাইতে স্বতন্ত্র জাতি। তাদের ভাষা সাহিত্য হবে আলাদা। আওয়ামী লীগের আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন এই মুসলিম বঙ্গ আন্দোলনের নেতা। এই বঙ্গের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের একটা জাতীয়তাগত খুবই সামান্য ঐক্য থাকবে। 
অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের সংজ্ঞায় বলা হয়, এই অঞ্চল সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে। অপর অংশের সঙ্গে একধরনের সম্পর্ক থাকবে। কিন্তু হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের মদ্যে পার্থক্য থাকবে। কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি হবে হিন্দু ও মুসলমানের কমন সম্পত্তি।

শেখ মুজিব এখানেই মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের সংজ্ঞার সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। তার স্বাধীন বাংলা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক রহিত সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অসাম্প্রাদিক বাংলাদেশ। মওলানা ভাসানী ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর জেনারেল আইয়ুবের সঙ্গে মৈত্রী করে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তাদের সৈন্যবাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য। বিপরীতে শেখ মুজিব আইয়ুবের কোনো যুদ্ধকেই বাংলাদেশের ও বাঙালির যুদ্ধ বলে মনে করেননি। বরং ভারতের দালাল বলে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক অভিযুক্ত হয়েছিলেন।

এখানেই সিরাজুল ইসলাম হয়তো মওলানা ভাসানীর স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ও শেখ মুজিবের সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলার বিরাট পার্থক্য বুঝতে ভুল করেছিলেন। শেখ মুজিবই স্বাধীন বাংলার প্রথম ঘোষক এবং এর প্রতিষ্ঠাতা। আবুল হাসেম ছিলেন প্রথম স্বাপ্নিক। মওলানা ভাসানীর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। আবুল মনসুর চেয়েছিলেন মোসলেম বঙ্গের প্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের এই জটিলতাগুলো আমাদের বুঝতে ও শিখতে হবে।

বন্ধুবর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধের আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা অসমাপ্ত রইল। বাস্তবে তা নিয়ে আলোচনার ইচ্ছে রইল।

লন্ডন, ৪ ডিসেম্বর, শনিবার ২০২১

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

শিক্ষায় বিচ্ছিন্নতা বনাম বিচ্ছিন্নতার শিক্ষা

ইউনিভার্সের রহস্য উন্মোচনে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?