মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পৃথিবী রক্ষার শেষ সুযোগ: গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলন

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ২০:৪৮

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অচেনা গতিতে বিগত কয়েক শ বছরের চেনা পৃথিবীর চিরায়ত রূপটি যেন কোথায় হোঁচট খাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের যে ভয়াল রূপটা আরও প্রায় ১০০ বছর পর থেকে প্রত্যক্ষ করার কথা ছিল, তা যেন চলতি একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে অর্থাৎ এ মুহূর্তেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা হচ্ছে এই, মানুষ এবং সমগ্র প্রাণিজগৎ যেন বসুন্ধরার কোলে ক্রমশ: প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। বিগত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞরা যেসব সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আসছিলেন, তা যে এত দ্রুত কঠিন বাস্তবতা হয়ে ধরা দেবে-এখনো বোধ হয় পৃথিবীর অনেক মানুষের চিন্তার বাইরে।

ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দুই মেরু সবখান থেকেই যেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর একসঙ্গে আসতে শুরু করেছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলার খবরের পাশাপাশি আরও যেসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের খবর এসেছে সেগুলোর মধ্যে ছিল নজিরবিহীন দাবানল, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরা, অস্বাভাবিক প্রবল বৃষ্টিপাত, ভয়ানক ভূমিধ্বস, বন্যা এবং একই সঙ্গে অজস্র নদীর দুকূল ছাপানো প্লাবন। স্বভাবতই এসব ঘটনায় মানব-বসতি, শহর-গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য মানুষের জীবনহানির খবরও এসেছে। এরই মধ্যে স্পেনসহ নানা স্থানে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূমিকম্পের খবরগুলোর কথা না হয় অনুক্তই রাখা যাক। 

গত অক্টোবরের শেষে ১১/১২ অক্টোবরের চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শ্যানশি প্রদেশে ব্যাপক বন্যায় ১৭ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানকার স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানায়, মাত্র কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিতে প্রদেশটির ৭০টিরও বেশি জেলা ও শহরে বহু ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে এবং ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, চীনের শ্যানশি প্রদেশের প্রতিবেশী হেনান প্রদেশে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর তিন মাসের মধ্য শ্যানশিতে বন্যা দেখা দেয়।

এদিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কবলিত এই পৃথিবীর আশু নিরাপদ ভবিষ্যৎ কামনায় স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কপ-২৬ অর্থাৎ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের দিকে প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিলেন। জলবায়ু সম্মেলন শেষে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নানা ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতিতে কেবল মিশ্র প্রতিক্রিয়াই এসেছে। কারো কারো মতে, প্যারিসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের নানা অপূর্ণতার ধারাবাহিকতায় এবারও প্রলম্বিত আশাহীনতার বাণী আরও  দীর্ঘ হয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, বিপন্ন পৃথিবী এবং ঝুঁকি কবলিত মানবজাতিসহ এই বসুন্ধরার জীব জগতের ভবিষ্যৎ কি অনিবার্য ধ্বংসের দিকে? এই সম্মেলন উপলক্ষে ঐ ছবিটির কথাও সবাইকে নাড়া দিয়েছে, যেখানে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে বিশাল গ্রহাণু আছড়ে পড়ার কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাইনোসরদের একটি এনিমিটেড ডাইনোসর প্রতিনিধি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলছে, ‘আমরা স্বেচ্ছায় পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হইনি। কিন্তু আজ দেখতে পাচ্ছি আধুনিককালের মানবজাতি জেনে শুনে আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে তারা তাদের ধ্বংস-বিলুপ্তির মহাসড়ক প্রস্তুত করছে’। অবশ্য একই সময়ে বিজ্ঞানীদের অনেকেই আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রকৃতি বিশ্বের নানা স্থানে ইতিমধ্যে ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ মাত্রায় কার্বন, মিথেনসহ ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ, আমাজানের রেইন ফরেস্ট ও বিশ্বের সর্বত্র বনাঞ্চলের নির্মম বিনাশসহ আনুষঙ্গিক মানবসৃষ্ট তৎপরতাই এই ধ্বংসাত্মক ভবিষ্যৎকে ডেকে আনার অন্যতম কারণ। এরই সঙ্গে আরও বেদনার আরেকটি সংবাদ দিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাশূন্য থেকে পৃথিবীকে আগের মতো আর সপ্রতিভ নীল দেখা যায় না। পৃথিবী তার ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে। 

এই কথাটি হয়তো ইতিমধ্যে কেউ কেউ জেনেছেন যে, জাতিসংঘের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘গ্লোবাল চেঞ্জ বায়োলজি’-তে প্রকাশিত ‘ ইউনাইটেড নেশনস্ অ্যাসেসমেন্ট অব ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন্স’ শীর্ষক একটি রিপোর্টে সম্প্রতি বলেছেন, আর মাত্র ৪০০ বছরের মধ্যে পৃথিবী নামের এই নীল গ্রহটি দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর বাসযোগ্য থাকবে না। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, সম্প্রতি বিভিন্ন রাষ্ট্র গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কমানোর যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি অনুসৃত হলেও আর মাত্র ৭৯ বছরের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রাক শিল্পযুগের চেয়ে অন্তত ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ফলে এমন ঘন ঘন ও ভয়ঙ্কর দাবানল হবে বিশ্ব জুড়ে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। আমরা ২০২১ সালেই অর্থাৎ এ বছর আমেরিকা, রাশিয়া, ইউরোপ, এশিয়া, মধ্য এশিয়াসহ পৃথিবীর নানা স্থানে বন্যা, তাপপ্রবাহ, ভূমিধস ও প্রলয়ঙ্করী দাবানলের ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞ দেখে ফেলেছি।

প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ২০১৫ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখার যে কথা বলা হয়েছিলে এবার গ্লাসগোতে বিষয়টি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ, বিশ্বে সর্বাধিক পরিমাণ কার্বন নিঃসারণ করে থাকে এ দুটি দেশই। বিজ্ঞানীরা তো সাফ সাফ বলেই দিয়েছেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নই জলবায়ু পরিবর্তন এবং চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া সৃষ্টির অন্যতম কারণ। 

মধ্য নভেম্বরে যখন জলবায়ু সম্মেলনে তীব্র দরকষাকষি এবং একের পর এক ঘোষণা আসছিল—তাতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের একজন বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে যা বললেন তাতে হতাশার সুর ফুটে ওঠে। ড. সেলিমুল হক বললেন, প্যারিস সম্মেলনে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মেলেনি। গ্লাসগো সম্মেলনে তাই ধনী দেশগুলো ক্ষমা চেয়েছেন। বিগত সম্মেলনের প্রতিশ্রুতির ক্ষতিপূরণ থেকে এডাপটেশনের জন্য দরিদ্র দেশগুলোকে দেওয়া হয়েছে ২০ শতাংশ অর্থ। আর মিটিগেশনের নামে ধনী দেশগুলো নিয়ে নিয়েছে ৮০ শতাংশ অর্থ। তিনি বলেন, এই সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করার বিতর্কে হতাশার ছায়া প্রকট। যদিও আমি এই সম্মেলনে এসেছিলাম অনেক আশা নিয়ে। 

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুসারে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর। এই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত।  জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকরা বাংলাদেশকে ‘পোস্টার চাইল্ড’ হিসাবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। 

এই বছর আমরা এ-ও দেখেছি, সিরিয়া ও ইরাকের মতো দেশগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়াসহ খরার কারণে অঞ্চলগুলোতে খাবার ও কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বিগত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক খরার কবলে পড়ে সিরিয়া। দেশটিতে শত শত একর কৃষি জমি শুকিয়ে যায়। সিরিয়া ও ইরাকে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ পানি, খাবার ও বিদ্যুত্সুবিধা হারানোর মুখোমুখি হতে চলেছে বলে সতর্ক করে দেয় দেশগুলোতে কাজ করা ১৩টি দাতব্য সংস্থা। ইরানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ফসল উত্পাদনে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় পানির স্তর নিচে নেমে যায়। ফলে দেখা দেয় তীব্র পানিসংকট। অনেক নদী ও হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বেশির ভাগ বাঁধে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঘাটতি দেখা দেয়। পানির সংকট এভাবে বাড়তে থাকলে এসব দেশের মানুষ দেশত্যাগ করতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। 

ওপরে উল্লেখিত বিপর্যয়সমূহের প্রেক্ষিতে গ্লাসগো সম্মেলনে উদ্বেগাকুল কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, কপ-২৬ প্রেসিডেন্ট অলক শর্মা এবং জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, প্রিয় ধরিত্রী আজ সত্যিই মহাসংকটে। তাকে রক্ষায় মানব জাতির জন্য এটাই শেষ সুযোগ। 

লেখক: সাংবাদিক

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শঠতার অভিযোগ বিশ্বকে জানানো হোক

আইনের শাসন বজায় রাখতেই হবে

মুজিব দর্শন ভক্তি প্রজ্ঞা ও যুক্তির মেলবন্ধন 

বিদেশে বঙ্গবন্ধুর নামানুসারে সড়ক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পৃথিবীর সবচাইতে বড় গাছ 

ইলিশ উৎপাদনের সাফল্য ধরে রাখতে হবে

আনন্দ বেদনা ও সংকটে

তাইওয়ানকে ঘিরে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা কি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে?