পাহাড়ে কোটা বৈষম্যের অভিযোগ

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:৫১

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে কোটা বৈষম্য বিরাজ করছে। শিক্ষা ও চাকরিসহ সকল ক্ষেত্রে একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে তিন পার্বত্য জেলায় অন্য ১১ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ কোটার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে তাদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই। কোটার ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ দিতে হবে। নইলে কোটা উঠিয়ে দিতে হবে।’ রাঙ্গামাটির শুভলং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে বলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে আমরা ভাল আছি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছি।’ 

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি আর বান্দরবান জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন অপরূপ নৈসর্গের এক লীলাভূমি। শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এখানে ১২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, খেয়াং উষাই, পাংখু, চাক ইত্যাদি) এবং বাঙালিদের বসবাস। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাঝে ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ছড়িয়ে উপজাতি-বাঙালির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল। এই অঞ্চলের বিভিন্ন সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে (পার্বত্য জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম 

বিষয়ক উন্নয়ন বোর্ড, সিএইচটিআরসি, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, ভূমি কমিশন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) এক সম্প্রদায়ের লোকজনের আধিক্য বেশি। স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বাঙালি জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি সাহায্য/সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সাথে পার্বত্যাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, বিতর্কিত পরিবারের একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি একতরফাভাবে একটি সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণে সর্বদা সচেষ্ট। শান্তিচুক্তির পর গড়ে ওঠা সংস্থাসমূহ যেমন আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ইত্যাদিতে একটি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। বাংলাদেশ সরকার ৫ ভাগ উপজাতি কোটা বরাদ্দ করলেও এর অধিকাংশই একটি সম্প্রদায় ভোগ করছে। একই সঙ্গে বিদেশি সংস্থাসমূহের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতেও ঐ সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাপ্রবাহ এবং ঐ সম্প্রদায়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঐ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের মধ্যে একপ্রকার স্বার্থপরতা, ক্ষমতার প্রতি লোভ এবং যেকোনো প্রকারে শীর্ষ স্থান দখলের প্রবণতা কাজ করেছে। এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায় অনগ্রসরতার বেড়াজাল থেকে বের হতে পারছে না। ঐ সম্প্রদায়ের এই একক আধিপত্য ও স্বার্থপরতাকে অন্যান্য সম্প্রদায় মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু ঐ সম্প্রদায়ের বিতর্কিত ঐ ব্যক্তির মত বড় নেতাদের সশস্ত্র সংগঠন ও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মহলে যোগাযোগ থাকার কারণে তারা ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। এই বিতর্কিত ব্যক্তি শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠছে। চলতি বছর রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ ভূমিধসে শতাধিক ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর লোকজন প্রাণ হারালেও ঐ বিতর্কিত ব্যক্তি একটি সার্কেলের দায়িত্ব থাকার পরও তিনি একটি বারের মতো সেখানে যাননি। এমনকি কোন শোকও প্রকাশ করেননি। তাঁর এই আচরণ সাধারণ পাহাড়িদের কাছে অমানবিক বলে বিবেচিত হয়েছে।

আমাদের দেশের এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী শুধুমাত্র উপজাতিদের অধিকার, অনগ্রসরতা ও পশ্চাত্পদতা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে কাছে উপস্থাপন করছে। কিন্তু দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকায় যে বাঙালিরা উপজাতিদের চেয়েও অনেক বেশি অনগ্রসর, পশ্চাত্পদ ও বৈষম্যের শিকার তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামান না। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৮ম শ্রেণি পাস বেকার  কোন উপজাতি যুবক খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ একই অঞ্চলের হাজার হাজার বাঙালি যুবক বেকার হয়ে দেশ ও অর্থনীতির বোঝা হয়ে রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, অগ্রাধিকারের নামে একচেটিয়া উপজাতি প্রার্থীদের নিয়োগের ফলে বঞ্চিত হচ্ছে বাঙালি শিক্ষিত যুবকেরা। শান্তিচুক্তির আগে ও পরে হাজার হাজার পদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোককে নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যার মধ্যে একজন বাঙালিও নেই। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ক্যাডেট কলেজসহ সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বিষয়ে দুই থেকে পাঁচজন পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী উপজাতি কোটায় ভর্তির সুযোগ পায়। অথচ পার্বত্য বাঙালিদের তেমন কোন সুযোগ নেই। প্রশাসন এই বৈষম্য দূর না করলে যেকোনো মুহূর্তে এ নিয়ে সংঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।  

ইত্তেফাক/এমআর