সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

হাফ ভাড়া: প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:০৯

ছোটবেলায় আমরা যে স্কুলে পড়তাম সেটিতে যেতে কোনো নদী বা খাল পার হতে হতো না। তবে আমাদের সহপাঠী কেউ কেউ কপোতাক্ষ নদ পার হয়ে স্কুলে যেত। নদীতে খেয়া থাকত। পাটনি (খেয়া মাঝিকে স্থানীয় ভাষায় পাটনি বলে) ছাত্রদেরকে বিনে পয়সায় নদী পার করে দিতেন। যিনি পাটনির কাজটি করতেন, তিনি অতিশয় গরিব লোক। ধুতি পরে, খালি গায়ে, খেয়া নৌকা পারাপার করতেন। খেয়া নৌকার অবস্থা আর তার অবস্থার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। বহু দিনের পুরাতন একটি ভাঙা নৌকা দিয়ে এ পারাপারের কাজ চলত। নৌকাডুবি যে হয়নি সেটি ভাগ্যের ব্যাপার। এই গরিব লোকটি ছাত্রদের কাছ থেকে কোনো ভাড়া বা টোল নিতেন না। বলতেন, ওরা পড়ালেখা করছে, টাকা কোথায় পাবে? কী অসাধারণ আত্মত্যাগ। এ পাটনির ঋণ কি কোনো কিছুর বিনিময়ে পরিশোধ করা সম্ভব? 

বাংলাদেশে বাসভাড়া নিয়ে এখন নৈরাজ্য চলছে। ছাত্ররা বলেছে তাদের কাছ থেকে ‘হাফ ভাড়া’ নিতে হবে। অন্যদিকে বাস মালিকরা বলছে, না আমরা ‘হাফ ভাড়া’ নেব না। ছাত্রদেরকে বাসে উঠলে পুরা ভাড়া দিতে হবে। আবার তারা বলছেন, যদি ‘হাফ ভাড়া’ নিতে হয়, তবে সরকারকে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। অথচ যুগ যুগ ধরে ছাত্ররা এ সুবিধা পেয়ে আসছেন। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল আলমের মতে, ১৯৬৪ সালে বিআরটিসির বাস চালু হলে তখন হতে ছাত্রদের কাছ থেকে ‘হাফ ভাড়া’ নেওয়ার সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পরেও আগের মতো ছাত্ররা এ সুবিধা পেয়ে আসছে। বাস মালিক বা শ্রমিক সমিতি কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। আমরাও যখন বিএল কলেজে পড়ালেখা করেছি, খুলনা শহর থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত ‘হাফ ভাড়া’ দিয়ে যাতায়াত করতাম।

স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের যে কোটিপতি ২২ পরিবার সব ব্যবসায়-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের মধ্যে দুটি পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। এর বাইরে কিছু জমিদার পরিবার ছিল, তারাও বিত্তশালী। যে পরিবারগুলি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবসা করতেন, তারা কেউ পরিবহন ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না জানা নেই। স্বাধীনতার পরে নব্য পুঁজিবাদের যে বিকাশ ঘটে, সেখানে পরিবহন খাত একটি উল্লেখযোগ্য সেক্টর হিসেবে স্থান পায়। উন্নয়ন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এ খাতও বিকশিত হয়। দু-এক জন বাস শ্রমিক অবৈধভাবে এ সেক্টরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। শ্রমিকশ্রেণি থেকে তাদের আগমন হওয়ার কারণে তারা উভয় সেক্টরে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন। তারই প্রমাণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই, একজন বাস মালিক সমিতির নেতা ২/১টি বাস নিয়ে তার যাত্রা শুরু করলেও ১০ বছরে ২৫০ বাসের মালিক বনে যান। পরিবহন সেক্টরটি সবচেয়ে নৈরাজ্যপূর্ণ একটি সেক্টর। তারা কেউ রাষ্ট্রীয় আইনকানুন ও নিয়ম-নীতি মানতে চান না। তারা যেন স্বঘোষিত জমিদার। মালিকসংগঠন ও শ্রমিকসংগঠনগুলি একত্রে চাঁদাবাজি, রাস্তা দখল, টার্মিনাল দখল, অবরোধ, অবৈধ পার্কিং, জাল ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্ত ড্রাইভারদের নিয়োগ ইত্যাদি অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত। 

শ্রমিকসংগঠনের  কতিপয় নেতা সংগঠনের নামে সাধারণ শ্রমিকদের নামে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করলেও সাধারণ শ্রমিকদের কল্যাণে তা কতটুকু ব্যবহার করা হয়, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। করোনার সময় দেখেছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবহন শ্রমিকদের জন্য আলাদা করে মানবিক সহায়তা প্রদান করেছেন। অথচ পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের শ্রমিকদের কল্যাণে তেমন কোনো সহায়তা প্রদান করেছেন বলে জানা যায়নি। কল্যাণ তহবিলের নামে যে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়, সেটি কোথায় যায়?

বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড বাসের সংখ্যা নভেম্বর, ২১ পর্যন্ত ৪৯ হাজার ২৭৩টি। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক বাস হিসেবে চলাচল করে। তাদের না আছে রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, রুট পারমিট। চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্সও জাল। রং ওঠা, রং চটা, নম্বর প্লেটবিহীন বাস কী করে ফিটনেস সনদ পায় এবং ঢাকা মহানগরীতে চলাচল করে, সেটি বিস্ময়! যারা এদের ফিটনেস সনদ দেন তাদের বিরুদ্ধে কি কখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

যিনি বাসের মালিক তার বাস রাখার জন্য গ্যারেজ থাকার কথা। অথচ তাদের কোনো গ্যারেজ নেই। সরকারি রাস্তার একটি অংশ দখল করে সারি সারি করে বাস রেখেছেন। সম্পূর্ণ রাস্তাটি ব্যবহার না করতে পারায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা হচ্ছে এবং যানজটের কবলে পড়ছে ভুক্তভোগী জনগণ। ব্যবসায় করবেন তিনি আর বিড়ম্বনা সহ্য করতে হবে নগরবাসীকে। এর অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কি কেউ নেই?

আমি তখন গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক। গোপালগঞ্জের বিপুলসংখ্যক নাগরিক চিকিৎসা, ব্যবসা, পর্যটন ইত্যাদি কারণে ভারতে যাতায়াত করেন। তারা একদিন আমার কাছে আবেদন করলেন যে, গোপালগঞ্জ হতে বেনাপোল পর্যন্ত একটি বিআরটিসি বাসের সার্ভিস চালু করলে ভ্রমণপিপাসু লোকজনের প্রভূত উপকার হয়। আমি বিআরটিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বাসের ব্যবস্থা করি। বাসটি যখন চলাচল শুরু করে তখন বাসমালিক ও শ্রমিক সমিতি এটি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। বাসটি একবার ভাঙচুরেরও শিকার হয়। আমি এ বিষয়ে একটি সভার আয়োজন করে মালিক ও শ্রমিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তারা যেসব বিষয়ে অবতারণা করেন তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক ও বিরক্তিকরও বটে। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে আমি তাদেরকে সর্বশেষ বলি, ঠিক আছে আপনারা একটি বাস সরাসরি গোপালগঞ্জ থেকে বেনাপোল পর্যন্ত পরিচালনা করুন। কিন্তু এ প্রস্তাবেও তারা অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। রাস্তা সরকারের, মেরামত বাবদ সরকার কোটি কোটি জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় করেন অথচ সরকার মালিকানাধীন বাস চলাচল করতে পারবে না। কী দুর্ভাগ্য আমাদের? শেষ পর্যন্ত বিআরটিসির এ সার্ভিসটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৬৯ সালের ১১ দফায় ছাত্রদের ‘হাফ ভাড়া’ নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। ছাত্ররা শুধু তাদের স্বার্থ নিয়ে আন্দোলন করেনি। তারা শ্রমিকদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্যও বলেছিল। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বলা হয়েছে। সেই শ্রমিকরা আজ ছাত্রদের বিপক্ষে। শ্রমিক ও মালিকরা একজোট হয়ে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এমনকি ‘হাফ ভাড়া’ দেওয়ায় দু-এক জন শিক্ষার্থীকে তারা বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেও দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে জনসাধারণ ১২ বছরের বেশি সময় চলাচল করলে যেমন সেটি ‘পাবলিক এজমেন্ট’ বা পথাধিকারে পরিণত হয়, তেমনি ৫৮ বছর ধরে প্রাপ্ত ‘হাফ ভাড়া’-এর অধিকার ছাত্রদের বৈধ অধিকারে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি উন্নত বা অনুন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করি, তবে দেখতে পাই সেখানে বাস, ট্রেন বা অন্যান্য যানবাহনে শিশু-ছাত্র-বৃদ্ধ-প্রতিবন্ধী জনগণের জন্য  ‘কনসেসন’ ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। 

রাষ্ট্রের চেয়ে বড় কেউ নয়। রাষ্ট্র আইন করে পরিবহনে ছাত্রদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে পারে। পরিবহন মালিক-শ্রমিক মালিকগণ সেটি না মানলে সংঘর্ষ অনিবার্য। এতে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না। বাস বন্ধ থাকলে মালিক বা তথাকথিত শ্রমিকনেতাদের তেমন ক্ষতি হয় না। ক্ষতি হয় সাধারণ পরিবহন শ্রমিকদের আর জনগণের। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার মনোভাবকে অক্ষুন্ন রেখে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের উচিত কোনো ধরনের শর্ত প্রদান ছাড়া ছাত্রদের এ ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে গরিব সেই পাটনির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা।
 
লেখক: (সিনিয়র সচিব), নির্বাহী চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশ বিমানের পুরোনো দিনের কিছু কথা

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা

নাসিক নির্বাচনের চোখ দিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির অন্বেষণ

কৃষির উন্নয়ন কেন প্রয়োজন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির পথ

মাদকের ছোবল থেকে কে বাঁচাবে তরুণদের?

দক্ষিণ এশিয়ার যুবশক্তির সদ্ব্যবহার 

ভালো থাকা না থাকা