শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

এই লেভেল ক্রসিংগুলি কাহার? 

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:৪০

গত রবিবার নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় একজন ইজিবাইকচালকের মৃত্যু হইয়াছে মর্মান্তিকভাবে।

ট্রেনটি ইজিবাইকটিকে টানিয়া লইয়া যায় প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। রেলক্রসিং দুর্ঘটনা আমরা জন্মলগ্ন হইতেই দেখিতেছি। ইহার কি কোনো প্রতিকার নাই? রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং কেন অরক্ষিত থাকিবে? কেন তাহা পরিণত হইবে মৃত্যুফাঁদে? 

রেলওয়ের সূত্র মতে, সমগ্র দেশে রেলপথে মোট ক্রসিং রহিয়াছে ২ হাজার ৮৫৬টি। ইহার মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টিরই কোনো অনুমোদন নাই। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টি ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নাই। গেটম্যান বা পাহারাদার না থাকিলে দুর্ঘটনা ঘটাই তো স্বাভাবিক। অননুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়িলেও একই কথা প্রযোজ্য। 

এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, আমাদের দেশে গত প্রায় তিন বত্সরে রেল-দুর্ঘটনায় ১ হাজার মানুষ মারা গিয়াছেন। আহত ও পঙ্গু হইয়াছেন দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ। এই রেল-দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হয়, তাহার ৮৯ শতাংশই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে ঘটিয়া থাকে। রেলওয়ের এই লেভেল ক্রসিংগুলোর (বৈধ-অবৈধ) প্রায় ৮৪ শতাংশই অরক্ষিত।

এই সকল ক্রসিং নিরাপদ করিবার বিষয়টি কি আমলে নেওয়া হইবে না? অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণেও লেভেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। তবে এই সকল ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মাণকারী বিভিন্ন সংস্থার খামখেয়ালিপনা ও রেলওয়ের উদাসীনতাও কম দায়ী নহে। সবচাইতে দুঃখজনক খবর হইল, অধিকাংশ সংস্থা রেলপথের ওপর দিয়া লেভেল ক্রসিং নির্মাণের সময় রেলওয়ের অনুমোদন লইতেছে না।

মানুষের চাহিদার প্রয়োজনে বা স্হানীয় জনপ্রতিনিধিদের চাপে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ বিভিন্ন সংস্থা সড়ক নির্মাণ করিতেছে। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদও টিআর-কাবিখা দিয়া এই সকল স্থানে রাস্তা তৈরি করিতেছে। তাহারা বৈধ বা অবৈধভাবে রেলওয়ে ও সড়কপথের সংযোগস্থলে তৈরি করিতেছে রেলক্রসিং। খেয়ালখুশিমতো এইভাবে লেভেল ক্রসিং তৈরি করিতে দেওয়া যায় না।

অনুমোদন নেওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাও করা হয় না। অথচ সেখানকার জমির মালিক রেলওয়ে। এই ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়া ছাড়া উপায় নাই। লেভেল ক্রসিং কে ও কেন করিতেছে, তাহার ব্যাপারে খোঁজখবর করিয়া ব্যবস্থা লইতে হইবে। আমাদের রাষ্ট্রে আসলে হইতেছে কী? কোনো দুর্ঘটনা ঘটিলে সেইখানে মন্ত্রী পর্যন্ত গিয়া হাজির হন; কিন্তু তাহারা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বেলায় ব্যর্থতার পরিচয় দেন। উন্নয়নশীল বিশ্বের শুধু মডেল হইলেই চলিবে না, কার্যক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ লইতে হইবে। গত এক যুগে রেলওয়েতে ১ লক্ষ ৬৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে। 

অথচ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা রোধকল্পে তেমন কোনো বড় অঙ্কের অর্থের প্রকল্প গ্রহণ করা হয় নাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি টাঙাইয়াই দায় সারা হইতেছে। শুধু গ্রামগঞ্জই নহে, খোদ রাজধানীর আশপাশেও লেভেল ক্রসিংগুলোর অবস্থা ভালো নহে। 

রাজধানীসহ আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে। ইহার মধ্যে আবার ২৩টি অরিক্ষত ও অননুমোদিত। কোনোটিতে নাই গেটম্যান ও সিগন্যাল বার। মানুষের জীবনকে এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলিয়া রাখা যায় না। লেভেল ক্রসিং দিয়া রাস্তা পারাপারে আমাদেরও সতর্ক হইতে হইবে। আরেকটি বিষয় হইল—গত এক যুগে ছোট-বড় মিলিয়া প্রায় সাড়ে ৮ হাজার রেল-দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে।

এই সকল দুর্ঘটনার পর গঠিত হইয়াছে ৮ হাজার তদন্ত কমিটি। সকল কমিটিই প্রতিবেদন জমা দিয়াছে; কিন্তু ৯০ শতাংশ প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় নাই। সুপারিশ বাস্তবায়ন না হইলে লোকদেখানো তদন্ত কমিটি করিয়া কী লাভ? আমরা আশা করি, লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষ বাস্তবচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন। 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শৃঙ্খলাই পরিত্রাণের পথ

জনগণের প্রতিবাদ ও প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে

নিজেকে চিনিয়াছি কি?

বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের ভাবিয়া দেখা উচিত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা যাইবে না

‘ক্ষীণছন্দ মন্দগতি তব রাত্রিদিন’ 

অর্থনৈতিক সংকট লইয়া নীতিনির্ধারকদের ভাবিতে হইবে

ভোটের বহুবিধ মূল্য জনগণকে বুঝিতে হইবে