বন্ডসুবিধা: অনিয়মই যেন নিয়ম হইয়াছে! 

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৩৯

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের রাজস্ব বোর্ড শুল্কমুক্তসুবিধা দিয়া থাকে একটি মহতী উদ্দেশ্যে। এক কথায় বলিতে গেলে সরকারের উদ্দেশ্য হইল, দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পকে চাঙ্গা রাখা।

যদিও এই বাবদ সরকারকে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ছাড় দিতে হয়; কিন্তু এই সুবিধা যখন দিনের পর দিন অপব্যবহার দেখা যায়, তখন যে কাহারো মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ঔদার্য কখনো কখনো, কোনো কোনো জাতির জন্য অভিশাপ হইয়া নামিয়া আসে। এবং এই সুবিধা নানা কৌশলে অপব্যবহার করা হইতেছে; অনিয়মের আশ্রয় লওয়া হইতেছে।

ইহার মধ্যে প্রধানত বন্ড লাইসেন্সে সঠিকভাবে পণ্যের প্রাপ্যতা নির্ধারণ না করা, বন্ডে আমদানির তথ্য পাশ বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ না করা, বন্ডেড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠাগুলিতে যথাযথ অডিট না করা ইত্যাদি।

ইহার ফলে রপ্তানির শর্তে আমদানি করা শুল্কমুক্তসুবিধার পণ্য খোলা বাজারে বিক্রয় করিয়া রাজস্ব ফাঁকি, আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা, কম দামে ক্রয় করা পণ্যের অধিক মূল্য দেখানো যেন নিয়মে পরিণত হইয়াছে। জানিয়া অবাক হইতে হয়, শুল্কমুক্ত পণ্য শুল্কমুক্তভাবে পরবর্তী সময়ে রপ্তানির জন্য সংরক্ষিত হওয়ার যেই ওয়্যার হাউজ সেইখানে যায় না! তবে সকলেই যে এমন করিতেছেন তাহা আমরা বলিতে পারিব না।

তবে ইহার পিছনে রহিয়াছে একাধিক চক্র। সরকার আমদানি পর্যায়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা শুল্ক কর অব্যাহতি দিয়া থাকে। অথচ বন্ডসুবিধায় আনা পণ্য খোলা বাজারে বিক্রয় কোনোক্রমেই কমিতেছে না। বন্ডসুবিধার অপব্যবহারে কেবল ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকিই নহে, ইহা হইয়া উঠিয়াছে মানি লন্ডারিংয়ের একটি অন্যতম হাতিয়ার।

অথচ এই সংক্রান্ত আইনকানুনে যে কোনো ঘাটতি রহিয়াছে তাহা কিন্তু নহে। বাংলাদেশের কাস্টমস অ্যাক্ট যথেষ্ট সুস্পষ্ট ও কঠিন। সরকার লাইসেন্সিং ব্যবস্হাকে যথেষ্ট কঠিন করিয়াছে; কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপ্তি কঠিন করিয়া তোলা তো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ নহে। লাইসেন্সপ্রাপ্তি, নবায়ন ও বাতিল বিষয়ে কাস্টমস আইন অত্যন্ত শক্তিশালী; কিন্তু প্রয়োগ না থাকিলে আইন থাকা না থাকায় কী আসে-যায়! শুল্কমুক্ত আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধাপ্রাপ্ত রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার নিয়ন্ত্রক সংস্হা হইল ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

কোন পণ্য কোন প্রতিষ্ঠানে কী কাজে প্রয়োজন, তাহা নির্ধারণ করিয়া দেয় শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যার্পণ পরিদপ্তর; কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে অসহায় বলিয়া মনে হইতেছে। তাহার কারণ, এমন অভিযোগ রহিয়াছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ডসুবিধা অপব্যবহারের পিছনে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে। তাহাদের হুমকি-ধামকিও সঠিকভাবে কার্যসম্পাদন বাধাগ্রস্ত করিতেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পাওনা রাজস্ব সঠিকভাবে পরিশোধ করে না।

অনেক প্রতিষ্ঠান আবার মামলা করিয়া বছরের পর বছর আইনি মারপ্যাঁচে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া স্থগিত করিয়া রাখে। কর্তৃপক্ষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনগত পদক্ষেপ লইতে চেষ্টা করে না তাহা নহে, তবে ইহাও মনে রাখা দরকার যে, যাহারা আইনগত পদক্ষেপের দিকে যাইবেন, তাহাদেরই আবার বিষয়টি জটিল করিয়া তুলিবার বা দীর্ঘসূত্রতা তৈরির সুযোগ রহিয়াছে। 

সুতরাং সরকারের উচিত হইবে বন্ডসুবিধা গ্রহণকারী এবং তদারকি কর্তৃপক্ষ উভয়ের ব্যাপারেই সতর্ক পদক্ষেপ লওয়া। এইভাবে একটি দেশ চলিতে পারে না্ চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়ম কমবেশি পৃথিবীর সকল দেশেই রহিয়াছে; কিন্তু এহেন জবাবদিহিতামুক্ত পরিবেশ বোধকরি আর কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন