এই জনদুর্ভোগের শেষ কোথায়?

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:২৮

প্রায় ২ কোটিরও অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা মহানগরী বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি হিসাবে পরিচিত। মেগাসিটি অভিধায় ভূষিত হইলেও রাজধানী ঢাকা শহর বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিশেষত যানজট সমস্যার কারণে ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম সমস্যাবহুল শহর হিসেবেও পরিচিত পাইয়াছে। ইহা সত্য রাজধানী ঢাকা হইতে শুরু করিয়া দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর-উপশহরে যানজট কোনো নূতন সমস্যা নহে। তবে দিন দিন এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করিতেছে যাহার ফলে নষ্ট হইতেছে কর্মঘণ্টা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হইয়া থাকে। যানজটের কারণে যেই সময়ক্ষেপণ ঘটিতেছে, অর্থনীতির বিচারে তাহার ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ। এই সমস্যা উত্পাদনশীলতাকেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করিতেছে। যানজটের কারণে কেবল সময়ক্ষেপণ আর আর্থিক ক্ষতিই নহে, ইহা শরীর-মনের ওপরও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে, বহু মানুষের মনে তৈরি করিতেছে অস্থিরতা, বিরক্তি আর উদ্বেগ। মানসিক চাপ হইতে তৈরি হইতেছে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা। 

ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই, যানজট কেবল ঢাকা শহরের একারই সমস্যা নহে, বিশ্বের বড় বড় মেগাসিটিগুলিতেও যানজট সমস্যা ভয়াবহ সমস্যারূপে স্বীকৃত। তথাপি বিশ্বের অন্য যে কোনো মেগাসিটির তুলনায় আয়তন বিবেচনায় ঢাকা শহরের জনসংখ্যা অত্যধিক। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক শহরের মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ রাস্তাঘাট থাকা বাঞ্ছনীয়। অথচ ঢাকা শহরের মোট আয়তনের তুলনায় রাস্তাঘাট রহিয়াছে মাত্র ৭ হইতে ৮ শতাংশ। এই অপ্রতুল রাস্তাঘাটের ৭০ শতাংশই দখল করিয়া রাখে ব্যক্তিগত বিভিন্ন যানবাহন যাহাতে চলাচল করিয়া থাকে মোট জনসংখ্যার মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষ। 

তবে কেবল ব্যক্তিগত যানবহনই ঢাকার রাস্তাঘাটে সৃষ্ট অসহনীয় যানজটের প্রধান এবং একমাত্র কারণ নহে। দেখা যাইতেছে একই রাস্তায় একই সময়ে যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি, অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, মালবাহী ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ঠেলাগাড়ি ও ট্রাক চলাচল করিতেছে যাহাদের জন্য আলাদা আলাদা লেনের ব্যবস্থা নাই। ইহার ফলে বিভিন্ন যানবাহনের অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক চলাচলে রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিত যানজট সৃষ্টি হইতেছে। পাশাপাশি সড়ক অব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতার কারণেও যানজট ক্রমেই তীব্র হইতে তীব্রতর হইতেছে। দেখা যায় এক সংস্থা হয়তো রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করিতেছে, অন্য আরেক সংস্থা গ্যাসলাইন ঠিক করিতেছে, আরেক সংস্থা হয়তো বাকিদের সহিত সমন্বয় না করিয়াই ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কারকাজ শুরু করিতেছে। আবার দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, হিসাব-নিকাশ না করিয়া যত্রতত্র পার্কিং অনুমোদন দেওয়া ইত্যাদিও যানজটের অন্যতম কারণ। ঢাকা শহরে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল রাস্তাঘাট ও ফুটপাথের বড় একটি অংশই দখল করিয়া সেইখানে হকারদের বসানো হয়, ইহার ফলে রাস্তা সংকুচিত হইয়া যায়, যানজটে ভোগান্তিতে পড়িয়া যায় মানুষ। 

রাজধানী ঢাকা শহরের যানজটের কারণ লইয়া বিস্তর গবেষণা হইয়া আসিতেছে, যানজট নিরসনেও নেওয়া হইয়াছে কোটি কোটি টাকার নানা পরিকল্পনা। কিন্তু তাহার পরও  অবস্থা তথৈবচ। ইহার কারণ হইল সমস্যা সমাধানে সমন্বয়হীনতা। যানজটের মতো জটিল সমস্যার সমাধানে যে যাহার মতো চেষ্টা করিতেছেন। ফলে তাহা কাজে না আসিয়া  নূতন সংকট সৃষ্টি করিতেছে। ইহা সত্য যে, যানজট নিরসনের লক্ষ্যে রাজধানীতে বর্তমানে বড় বড় বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান রহিয়াছে, তবে বড় বড় প্রকল্প আর অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সমস্যা মোকাবিলায় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ,  ট্রাফিক বিভাগ, নগর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করিতে হইবে। 

 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন