ভাষায় রাজনীতি, রাজনীতির ভাষা

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৫১

ভাষা প্রত্যক্ষভাবে মানুষের কর্মপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। মানুষের শ্রমের সঙ্গে তার ভাষা ঘনিষ্ঠভাবে অন্তঃসম্পর্কিত। স্টালিন জল, বিদ্যুত্, জ্বালানির মতো ভাষাকেও উত্পাদনের আবশ্যকীয় উপাদান বলে মনে করতেন। এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয় উদ্দীপনাও বটে। ভাষা অর্থনীতি বা উত্পাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের নিকট ভাষা হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যাকে ব্যবহার করে তাদের শাসন ও শোষণ চালিয়ে যান। ফুকো তার ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে দেখান যে যুগে যুগে মানুষের জীবন-দর্শন,তার ধ্যান-ধারণা, জ্ঞানের পরিধি ও প্রকৃতি, যৌক্তিক-অযৌক্তিকের ভেদাভেদ সবই নিয়ন্ত্রিত হয় ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের তৈরি Discourse বা বাক জগত্ দ্বারা।

জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’ নামক উপন্যাসে দেখা যায় শাসক শে্রিণ তাদের জনগণের বাক-স্বাধীনতাকে অবদমন করার জন্য তাদের ভাষা থেকে কিছু প্রচলিত শব্দ বাতিল করে দেন। এর মাধ্যমে জনগণের বাক-স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় ‘স্বাধীনতা’ বা ‘বাংলাদেশ’ নামক শব্দগুলো উচ্চারণ করতে দেওয়া হতো না। তাই কবি শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তার ‘বন্দী শিবির থেকে’ নামক কবিতায় লিখেছিলেন- অথচ এ দেশে আমি আজ দমবন্ধ /এ বন্দীশিবিরে/ মাথা খুঁড়ে মরলেও পারি না করতে উচ্চারণ/ মনের মতন শব্দ কোনা।

 যেকোনো ধরনের আন্দোলন, সংস্কার ও বিপ্লবের ক্ষেত্রে ভাষা ও তার সৃষ্টি সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন- রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে এন. জে. চেরনিশেভস্কির ‘কী করিতে হইবে?’ (What is to be done) উপন্যাসটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লেলিনের ভাই আলেকজান্ডার উলিয়ানভ বইটির বিপ্লবী চরিত্র, রাখমেটেভের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বেচ্ছাচারী জার তৃতীয় আলেকজান্ডারকে হত্যার চেষ্টা চালান। তার প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয় এবং তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। লেলিন রুশ বিপ্লবের পূর্বে নির্বাসিত থাকাকালীন সময়ে বিপ্লবীদের কাছে সবসময় জানতে চাইতেন তারা উপন্যাসটি পড়েছে কিনা। এভাবে ভাষা ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে। পাকিস্তান শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ভাষাকে ব্যবহার করে। কিন্তু পূর্ব বাংলার জনগণ তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলকে মেনে নেয়নি। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বেই ভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় এবং ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাভাষা ও সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বলে মনে করত। তাই রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যে কৌশল গ্রহণ করেছিলেন, তাতে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে ‘মুসলিম’ চরিত্রের ওপরে অধিক গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব বাংলায় আসলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে তার নিকট একটি স্মারকলিপি পেশ করা হয়। এতে বাংলাভাষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে আলাওল, নজরুল,কায়কোবাদ, সৈয়দ এমদাদ আলী, জসীমউদ্দীন প্রমুখের কথা উল্লেখ করা হলেও তারা রবীন্দ্রনাথের নাম সচেতনভাবে এড়িয়ে যান। এসময় ভাষা, বর্ণমালা বা বানান সংস্কারের প্রশ্নে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন। একপক্ষ বাংলাকে হিন্দুয়ানি বাংলা বলে অভিহিত করেন এবং এর সংস্কার হিসাবে প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনে দেদার উর্দু-ফারসি শব্দ আমদানি শুরু করেন। অন্যপক্ষ তীব্রভাবে এর বিরোধিতা করেন। তখনকার সময় কিছু কিছু লেখক তাদের লেখায় এমন এমন শব্দের আমদানি শুরু করেন যার অর্থ ছিল খুবই দুর্বোধ্য। এ সম্পর্কে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো:

‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবার কাবেলিয়াত উর্দুর রয়েছে। এই সমস্যার সমাধানের বুনিয়াদ তৈরি হয়ে গেছে। আমজানের এনতেজাম শুধু বাকি।... তবে পাকিস্তানের নাম নিয়ে আমার কিছু গোজারেশ রয়েছে।’ (মিজানুর রহমান, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার নাম’, মাহে নাও, আগস্ট ১৯৪৯)

এসময় অনেক লেখক, গবেষক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিনা প্রয়োজনে বিদেশি শব্দ আমদানি করার বিরোধিতা করেন। তারা মনে করতেন ভাষার সংস্কার হবে বিবর্তন প্রক্রিয়ায়, অর্থাত্ স্বাভাবিকভাবে; বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বা চাপিয়ে দিয়ে নয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য ছিল ভাষার মাধ্যমে জাতীয় সংহতি গড়ে তোলা। অপরদিকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে গড়ে ওঠা বৈষম্যই ছিল এ জাতীয় সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায়। আর ভাষা আন্দোলন ছিল সর্বক্ষেত্রে গড়ে ওঠা বৈষম্যরই প্রতিক্রিয়া। আমাদের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম তাত্পর্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭১ সালেও আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার। তাই এ ভিত্তিগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়