বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক ৫০ বছর পেরিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শুধু বিশ্বস্ত কূটনৈতিক সম্পর্কই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সময়ের পরিক্রমায় উভয় দেশই আবিভূর্ত হয়েছে একে অন্যের শক্তিশালী বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার; বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের পাঁচটি সর্ববৃহৎ রপ্তানিকৃত দেশের মধ্যে একটি। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে দুই দেশের পক্ষ থেকে বরাবরই যোগাযোগ-অবকাঠামোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্হানের কারণে বাংলাদেশ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ‘ট্রান্সপোর্ট হাব’ বা পরিবহনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন কানেকটিভিটি স্হাপিত হলে বাংলাদেশ ভারতের জন্যও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করতে পারে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বাইরে বাংলাদেশ-ভারত কানেকটিভিটি ‘প্যান-এশিয়ান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক’-এর অংশ হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১০৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। আর বিপরীতে আমদানি করা হয় ৫৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৬৭ কোটি ডলার। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ২৪টি স্হলবন্দর স্হাপন করেছে, যার মধ্যে বর্তমানে ১২টি বন্দর চালু রয়েছে; প্রস্তাবিত রয়েছে আরো দুটি স্হলবন্দর। এসব বন্দরের অধিকাংশই তৈরি করা হয়েছে কেবল পণ্য পরিবহনের জন্য। তবে বাংলাদেশের স্হলবন্দরগুলো মূলত সুবিধা দেয় ভারতের রপ্তানিকারকদের।
পণ্য রপ্তানি ছাড়াও এসব স্হলবন্দর ভারত তার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেভেন সিস্টার্সে পণ্য পরিবহনের জন্য ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ড দুটি উপায়ে ব্যবহার করতে পারে। প্রথমত ট্রানজিট, বা ভারতের যান ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এবং দ্বিতীয়ত ট্রান্সশিপমেন্ট বা বাংলাদেশের যান ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন।
প্রথমত, ট্রানজিট ব্যবস্হায় ভারতের পণ্যবাহী যান বাংলাদেশের প্রবেশ ও বাহির প্রান্তে ইমিগ্রেশন শেষ করে সেভেন সিস্টার্সে পৌঁছে যাবে। এক্ষেত্রে বারবার যান পরিবর্তন বা লোড/আনলোডের প্রয়োজন না থাকায় প্রক্রিয়াটি আপাতদৃষ্টিতে কম জটিল বলে মনে হয়। তবে কিছু প্রসঙ্গে জটিলতা থেকেই যায়, যেমন: চালকের ভিসা প্রসেসিং কীভাবে হবে? ভারতের যান বাংলাদেশে বিকল হলে করণীয় কী? অথবা, ভারতের নাগরিক দ্বারা বাংলাদেশে অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার কীভাবে হবে? এসব বিষয় উল্লেখ থাকতে হবে ‘এসওপি’ বা ‘স্ট্যান্ডার্ড পরিচালনা পদ্ধতিতে’, যেটি তৈরির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এসওপি প্রণয়নের সময় একটি হাবে বাংলাদেশের দুই সীমান্তের প্রশাসনিক কাজ ও নথিকরণ একবারে সম্পন্ন করে সময় ও জটিলতা কমিয়ে আনার ব্যাপারটি বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পণ্য বহনের জন্য সিংগেল কাস্টম হাউজ করা যেতে পারে, যেখানে প্রবেশ প্রান্তে কাস্টমস প্রসেসিংয়ের পর কনটেইনার সিল করে দেওয়া হবে। কাস্টমস চেকিংয়ের পর অবশ্যই ইলেকট্রনিক ট্যাগিং করতে হবে এবং ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জের ব্যবস্হা রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, ট্রানজিট ব্যবস্হার কার্যকারিতা নির্ভর করে বিনিয়োগ, লজিস্টিকস ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর। ভারত বাংলাদেশেকে লাইন অব ক্রেডিটের মাধ্যমে তিন দফায় প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ ছাড়ের ঘোষণা দেয়, যার মধ্যে যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি| বিনিয়োগের অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক অতত্পরতা ও মহামারির কারণে পশ্চিমবঙ্গ-মেঘালয় ট্রানজিট করিডর প্রজেক্টটির নির্মাণকাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
ট্রান্সশিপমেন্ট একটি মালটিমোডাল ব্যবস্হা; যার প্রক্রিয়া ট্রানজিট ব্যবস্হার চেয়ে কিছুটা জটিল| ভারত-বাংলাদেশ ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্হায় তিনটি ধাপে পণ্য মূল গন্তব্যে পৌঁছায়| প্রথমে সমুদ্রপথে, এরপর বাংলাদেশি যানে করে ভারতীয় সীমান্তে, তারপর, আবার ভারতীয় যানে আনলোড/লোড করে পণ্য মূল গন্তব্যে পৌঁছাবে। এই লোড/আনলোড করতে হলে পণ্য বহনের খরচ ও সময় দুটোই বেড়ে যায়| তাই যদি বাংলাদেশের যান ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে মূল গন্তব্য পর্যন্ত পণ্য নিয়ে যেতে পারে, তাহলে খরচ ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হয়।
তবে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো এখনো ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য প্রস্ত্তত নয়। সেখানে কাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। আগত পণ্যের পরিমাণের ভিত্তিতে আলাদা জেটি স্হাপনের প্রয়োজন হতে পারে, সেক্ষেত্রে নির্মাণ খরচের পাশাপাশি পণ্য রপ্তানিকারকের ব্যয় ও বাড়বে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতিমধ্যেই ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য একটি মূল্যতালিকা প্রকাশ করেছে। অতি নিম্ন মূল্য ধার্য করার কারণে এটি নাগরিক সমাজে অত্যন্ত সমালোচিত হয়েছে। ধার্যকৃত মূল্য কম হওয়ার কারণ হলো, আমদানিকৃত পণ্যের পরিমাণ কম হওয়ায় সেগুলো বিতরণের জন্য আলাদা জেটি নির্মাণের প্রয়োজন হয়নি।
এছাড়া, এত কম মূল্য ধার্য করার পেছনে প্রান্তিক ব্যয় একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে :১ লাখ ইউনিট পণ্যের বিতরণ ব্যয়ের সঙ্গে ১০০ ইউনিট অতিরিক্ত পণ্যের বিতরণ ব্যয় যোগ করলে মোট ব্যয় সামান্যই বাড়ে, কিন্তু ১০০ ইউনিট অতিরিক্ত পণ্যের জন্য আলাদা জেটি তৈরি করা হলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে| যেহেতু জেটি নির্মাণ ব্যয়, তা চালানোর কর্মশক্তি ও শ্রমিক ব্যয় এবং অন্যন্য যন্ত্রপাতি পরিচালনার ব্যয় সেই খরচ থেকেই নির্বাহ করতে হবে| সেক্ষেত্রে, আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে যে এত উচ্চমূল্যে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পণ্য রপ্তানিতে আগ্রহী হবে কি না? এর পুরোটাই নির্ভর করে আগত পণ্যের পরিমাণের ওপর| যত বেশি পণ্য আসবে, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের রপ্তানি খরচ ততই কমবে।
ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে সেভেন সিস্টার্সে পণ্য পরিবহনের একটি ট্রায়াল হলেও এটি বর্তমানে বন্ধ আছে| প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও ব্যয়সংক্রান্ত কারণকে এর মূল কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করছেন। তবে বাংলাদেশের উচিত ভারতে ট্রান্সশিপমেন্টের প্রচারের মাধ্যমে এর প্রতি রপ্তানিকারকদের আগ্রহ এবং বাজার তৈরি করা।
ভারত বাংলাদেশের দুইটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে| অস্ত্র ও মাদক বাদে বাংলাদেশে উৎপাদিত সব পণ্য ভারতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায়, তাই বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগপ্রাপ্ত যে দুটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে সেখানে উৎপাদিত পণ্যও ভারতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে| উৎপাদনকারীরা যদি এই পণ্য সহজেই ভারতে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন তারা লাভবান হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের যান ব্যবহার হওয়ার কারণে বাংলাদেশও লাভবান হবে| নতুন বাজার তৈরির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্হান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভারতের বিনিয়োগ হতে পারে সেভেন সিস্টার্স বাজারমুখী, সেই অঞ্চলের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে| মূল ভূখণ্ড ও প্রায়বিচ্ছিন্ন সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে সেসব পণ্যের যাতায়াত বাধাহীন করতে ভারতের জন্য বাংলাদেশ হতে পারে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ মাধ্যম| সেজন্য ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্হার দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত হতে পারবে আরো অগ্রগামী। ভারতের প্রয়োজন থেকে বাংলাদেশ আয়ের নতুন উত্স তৈরি করতে পারে| অর্থনৈতিক নির্ভরতা একদিকে যেমন পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করে, অন্যদিকে এটি জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করে।
লেখক: গবেষক
